রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
করের আওতায় আসছে ১৬৫ সিসির বাইক বাংলা টেসলা
চাপে পড়বে লাখো মধ্যবিত্ত
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ৭:১৯ পিএম  আপডেট: ১২.০৫.২০২৬ ৭:৪২ পিএম  (ভিজিট : ৬৭)
X

দেশে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আসন্ন বাজেটে ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের ওপর বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। 

শুধু তাই নয়, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির বাইকের জন্য ৫ হাজার এবং ১১১ থেকে ১২৫ সিসির বাইকের জন্য ২ হাজার টাকা কর নির্ধারণেরও চিন্তা চলছে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিগত গাড়িকেও নতুন করের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বাজেটবিষয়ক বৈঠকে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। বর্তমানে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের সময় রোড ট্যাক্স পরিশোধ করতে হলেও নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী মালিকদের প্রতি বছর অগ্রিম আয়কর দিতে হবে। 

এনবিআরের ভাষ্য, করের আওতা বাড়ানো এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে সরকারের এই পরিকল্পনা নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ বাইক ব্যবহারকারী, রাইড শেয়ারিং চালক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে। 

কারণ দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৪৮ লাখেরও বেশি। এদের একটি বড় অংশ জীবিকা নির্বাহ, পণ্য সরবরাহ, রাইড শেয়ারিং, জরুরি সেবা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনেই মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। নতুন কর কার্যকর হলে লাখো মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এনবিআরের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী ১১০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল করমুক্ত থাকতে পারে। ১১১ থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত বাইকে বছরে ২ হাজার টাকা। ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির বাইকে ৫ হাজার টাকা। ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হতে পারে। বর্তমানে দুই বছরের জন্য মোটরসাইকেলের রোড ট্যাক্স ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১০ বছরের জন্য ১১ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। নতুন এআইটি চালু হলে বাইক মালিকদের জন্য ব্যয় বহুগুণে বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বা বিলাসবহুল যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের নজির থাকলেও বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে মোটরসাইকেল অনেকের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিবহন। বিশেষ করে দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থার কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে মোটরসাইকেল এখন দ্রুত যাতায়াতের অন্যতম ভরসা।

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে কর-জিডিপি অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। রাজস্ব আদায়ে নতুন উৎস খুঁজতেই যানবাহন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেছেন, বাইকের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপ করলে রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তার মতে, একসময় দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশের বেশি থাকলেও এখন তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। সরকারি সূত্র বলছে, উচ্চ সিসির বাইক ও বিলাসবহুল গাড়ির মালিকদের করের আওতায় আনাই মূল লক্ষ্য। 

এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের তথ্যমতে, দেশে ৩ হাজার সিসির বেশি ক্ষমতার অন্তত ৫ হাজার ২৮৮টি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এসইউভি নিবন্ধিত হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের যুক্তি, যাদের উচ্চ ক্ষমতার বাইক বা দামি গাড়ি কেনার সামর্থ্য রয়েছে, তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১২৫ বা ১৫০ সিসির বাইককেও করের আওতায় আনা হচ্ছে, যা মূলত মধ্যবিত্ত ও কর্মজীবী মানুষের ব্যবহৃত যান।

চাপে পড়বেন রাইডার ও ডেলিভারি কর্মীরা॥ দেশে গত কয়েক বছরে রাইড শেয়ারিং এবং অনলাইন ডেলিভারি সেবার বিস্তারের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। হাজার হাজার তরুণ বাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। নতুন কর কার্যকর হলে তাদের আয় কমে যেতে পারে। রাইড শেয়ারিং চালক আলী আহমেদ বলেন, তিনি ১২৫ সিসির মোটরসাইকেল চালান। জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও কিস্তির খরচ বাড়ায় এমনিতেই সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে নতুন করে কর আরোপ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

 তিনি আরও বলেন, নিরাপদ চলাচলের জন্য ১৫০ সিসির বাইক অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়। কিন্তু করের ভয়ে মানুষ কম ক্ষমতার বাইক কিনতে বাধ্য হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। রাইডার সংগঠনগুলোর নেতারাও বলছেন, বাইক এখন অনেক পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস। সেক্ষেত্রে কর আরোপের আগে সরকারকে বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। তারা প্রস্তাব দিয়েছেন, বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত বাইকের জন্য আলাদা নীতিমালা করা যেতে পারে।

‘বাংলা টেসলা’ও আসছে করের আওতায়॥ মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও করের আওতায় আনতে চায় এনবিআর। প্রস্তাব অনুযায়ী সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা, পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা, ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ১ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপ করা হতে পারে। দেশে বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। 

গত বছর সরকার ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’-এর খসড়া তৈরি করে, যেখানে নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, অনিবন্ধিত বিপুলসংখ্যক অটোরিকশাকে করের আওতায় আনা প্রশাসনিকভাবে কঠিন হবে। তাছাড়া গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে এই যানবাহনই অনেক মানুষের প্রধান জীবিকা।

মধ্যবিত্তের ওপর নতুন চাপ॥ অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, দেশে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার মধ্যে নতুন কর সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় অফিসগামী অনেক মানুষ গণপরিবহনের ভোগান্তি এড়াতে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। 

আবার ছোট ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সারদের অনেকে ব্যক্তিগত যাতায়াত ও কাজের প্রয়োজনে বাইক ব্যবহার করেন। নতুন কর কার্যকর হলে তাদের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোটরসাইকেলের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মানুষ উচ্চ সিসির বাইক কেনা থেকে সরে আসতে পারেন। ফলে বিক্রি কমে যেতে পারে, যা সংশ্লিষ্ট শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

কর নাকি নিয়ন্ত্রণ॥ অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, সরকার কেবল রাজস্ব আদায়ের জন্য নয়, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেও এই পদক্ষেপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুতগতির বাইক ও বেপরোয়া চালনার কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে উচ্চ সিসির বাইকের ওপর বাড়তি কর আরোপকে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, লাইসেন্সিং, প্রশিক্ষণ ও আইন প্রয়োগের ওপর জোর দেওয়া উচিত। কর বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

বাজেটে বড় বিতর্কের ইঙ্গিত॥ এনবিআরের প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী বাজেট ঘোষণার আগে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনা হবে বলে জানা গেছে। তবে প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব বাড়াতে সরকারকে অবশ্যই নতুন উৎস খুঁজতে হবে। কিন্তু কর নীতিতে ভারসাম্য জরুরি।

 বিলাসবহুল যানবাহনের ওপর কর বাড়ানো যৌক্তিক হলেও জীবিকা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের বাহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত সরকার প্রস্তাবিত কর কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনে কি না, নাকি নতুন অর্থবছর থেকেই লাখো মোটরসাইকেল মালিককে অতিরিক্ত করের বোঝা বহন করতে হবে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝