আবহাওয়ায় সুপার এল নিনোর ছায়া
তীব্র গরম, অনিয়মিত বর্ষা ও খাদ্যঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা
বিশেষ প্রতিনিধি

বিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন, অল্প সময়ের মধ্যে সক্রিয় হবে এল নিনো। শুধু তাই নয়, এ বছর হতে যাচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এল নিনো সক্রিয় হলে ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ওই সময় সমুদ্রস্নানের ব্যাপারে তারা সতর্ক থাকার পরামর্শও দিয়েছেন।
তাদের মতে, ‘সুপার এল নিনো’ কেবল আবহাওয়াকে অস্থির এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় ঘূর্ণিঝড় মৌসুমকে ত্বরান্বিত করবে না এর প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবর্তন মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ধরন, যা প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ করে তোলে। শুধু প্রশাপন্ত মহাসাগর এলাকায় নয় এর প্রভাব বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলেও পড়তে পারে বলেও সতর্ক করছে বিশেষজ্ঞরা।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল মান্নান বলেন সুপার এল নিনো দেশে আবহাওয়া জলবায়ু ও প্রতিকৃতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। এবার প্রভাবে অতিবৃষ্টি অকাল বন্যা এবং তাপপ্রবাহসহ আবহাওয়া বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি ফসল উৎপাদন ও স্বাস্থের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতা ঘিরে আবারও বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করছেন, শক্তিশালী বা “সুপার এল নিনো” পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু, কৃষি, জ্বালানি ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়তে পারে বড় ধরনের চাপ। ভৌগোলিকভাবে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকলেও বাংলাদেশ এর অভিঘাত থেকে নিরাপদ নয়। বরং ঘনবসতি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে এই অঞ্চলের প্রভাব হতে পারে আরও গভীর।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। কিন্তু যখন এই উষ্ণতা অত্যন্ত শক্তিশালী মাত্রায় পৌঁছে এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক প্রবাহকে বড়ভাবে বদলে দেয়, তখন সেটিকে “সুপার এল নিনো” বলা হয়। অতীতে ১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনো বিশ্বব্যাপী খরা, দাবানল, অতিবৃষ্টি, খাদ্যসংকট এবং অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ সৃষ্টি করেছিল।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বর্তমান বাস্তবতায় ভবিষ্যতের এল নিনো পরিস্থিতি আগের চেয়ে আরও তীব্র হতে পারে। কারণ পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে। ফলে এল নিনো তৈরি হলে তা বিদ্যমান উষ্ণতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এতে গরমের প্রকোপ, বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বাড়তে পারে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, সুপার এল নিনোর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব হতে পারে অসহনীয় গরম। বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে “হিট আইল্যান্ড” প্রভাবের কারণে তাপমাত্রা আরও বেশি অনুভূত হতে পারে। এতে শিশু, বয়স্ক এবং বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনোর কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু বা মনসুনের স্বাভাবিক আচরণেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বর্ষা দেরিতে শুরু হওয়া, আবার স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে কৃষি পরিকল্পনা ব্যাহত হবে। ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন সময়সূচি বিঘ্নিত হলে খাদ্য সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ শুষ্ক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়ে যেতে পারে। কৃষকেরা বলছেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা ও কম বৃষ্টিপাত হলে সেচ ব্যয় বাড়বে। ডিজেল ও বিদ্যুতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। এতে বাজারে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে জলবায়ুবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এল নিনো মানেই শুধু খরা নয়। কখনও কখনও এর প্রভাবে মৌসুমের শেষে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যাও হতে পারে। বিশেষ করে সিলেট ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল এবং স্বল্প সময়ে ভারী বর্ষণের ঝুঁকি থেকে যায়। উপকূলীয় এলাকায়ও জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার সমস্যা তীব্র হতে পারে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের আচরণেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সব এল নিনো বছরে একই ধরনের প্রভাব দেখা যায় না, তবুও উষ্ণ সমুদ্র শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। ফলে ভবিষ্যতে আরও বেশি তীব্র ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আবহাওয়াবিদরা। জ্বালানি খাতেও এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
দীর্ঘ তাপপ্রবাহে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে গরমকালে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও সেচের চাহিদা বাড়ার কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। সুপার এল নিনোর সময় এই চাপ আরও বাড়লে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ তাপমাত্রা শুধু মানুষের শারীরিক কষ্টই বাড়ায় না; এটি ডেঙ্গু, ডায়রিয়া এবং পানিবাহিত রোগের বিস্তারেও ভূমিকা রাখতে পারে। অনিয়মিত বৃষ্টি ও জমে থাকা পানি মশাবাহিত রোগ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্যবাজারেও এল নিনোর বড় প্রভাব পড়ে থাকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে খরা দেখা দিলে চাল, গম, চিনি ও ভোজ্যতেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তখন বাড়তি মূল্যচাপের মুখে পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আগাম প্রস্তুতি। কৃষিতে খরাসহিষ্ণু ও স্বল্পমেয়াদি জাতের ফসল বাড়ানো, পানি সংরক্ষণ, নগর এলাকায় সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করা দরকার। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
সুপার এল নিনো সরাসরি কোনো একদিনে “আঘাত” হানে না; বরং ধীরে ধীরে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ভারসাম্য বদলে দেয়। এর প্রভাব কখনও গরম, কখনও খরা, কখনও অতিবৃষ্টি বা অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে প্রকাশ পায়। তাই এটিকে শুধুমাত্র আবহাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পানি ও অর্থনীতির সম্মিলিত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় লড়ছে, তখন সুপার এল নিনোর সম্ভাবনা বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, প্রস্তুতি এখনই না নিলে ভবিষ্যতে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হয়ে উঠতে পারে।
আ.দৈ/আরএস





















