মৃত্যুর মিছিল থামছে না
সীমান্তের বিএসএফের মানুষ হত্যা প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে
শাহীন রহমান

সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে প্রায় প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ মানুষ। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ মে পর্যন্ত বিএসএফর গুলিতে প্রাণ গেছে ৬ জনের।
যারা নিরীহ ও দরিদ্র। গত শুক্রবার ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়। এ ঘটনার একটি ভিন্ন ব্যাখা দিয়েছে বিএসএফ। তারা বলছে চোরাচালান প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার্থে তারা গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছিল।
অথচ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে সীমান্তে গরু পাচার, চোরাচালান ও অবৈধ পারাপার রোধের যুক্তি দেখালেও বাস্তবে অনেক নিরীহ মানুষও গুলির শিকার হয়। সীমান্ত এলাকার দারিদ্র্য ও কর্মসংকট মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ঠেলে দেয়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে গ্রেফতার বা আইনি প্রক্রিয়ার বদলে গুলি চালানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।
সম্প্রতি সময়ে কথিত চোরাচালানের অভিযোগে প্রায়ই গুলির ঘটনার ঘটছে। কখনও গরু আনতে গিয়ে, কখনও সীমান্তঘেঁষা মাঠে কাজ করতে গিয়ে, আবার কখনও “সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারী” পরিচয়ে গুলিতে মরছে বাংলাদেশি নাগরিক। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে মৃত্যু যেন এক দীর্ঘস্থায়ী স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
দুই দেশের কূটনৈতিক বৈঠকে “শূন্য হত্যার” প্রতিশ্রুতি বারবার উচ্চারিত হলেও বাস্তবে সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ হয়নি। মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন ও সীমান্তবাসীর সাক্ষ্য বলছে এটি বিচ্ছিন্ন কিছু দুর্ঘটনা নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এক প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতার অংশ।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর বহুল আলোচিত গবেষণা প্রতিবেদন ট্রিগার হ্যাপি: এক্সেসিভ ইউজ অব ফোর্স বাই ইন্ডিয়ান ট্রুপস অ্যাট দ্য বাংলাদেশ বর্ডার বা বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিএসএফ সীমান্তে “অতিরিক্ত ও প্রায়শই বেআইনি প্রাণঘাতী শক্তি” ব্যবহার করছে।
প্রায় একশর বেশি সাক্ষাৎকার, প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় সাংবাদিক, চিকিৎসক ও মানবাধিকারকর্মীর তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে, এমনকি পেছন দিক থেকেও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা রয়েছে।
গবেষণাটি বলছে, সীমান্তে চোরাচালান ঠেকানো কিংবা অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের নামে বিএসএফ এমন এক “শুট-টু-স্টপ” সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, যেখানে সন্দেহভাজন কাউকে থামাতে প্রাণঘাতী গুলিকেই প্রথম উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রাণঘাতী শক্তি কেবল তখনই ব্যবহার করা যায়, যখন নিরাপত্তা বাহিনীর সামনে তাৎক্ষণিক প্রাণনাশের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনায় নিহতরা ছিলেন নিরস্ত্র কৃষক, শ্রমিক, কিশোর কিংবা সীমান্ত এলাকার দরিদ্র বাসিন্দা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে নিহতদের বড় অংশই দরিদ্র পরিবারের সদস্য। সীমান্ত এলাকায় বৈধ অর্থনৈতিক সুযোগ কম থাকায় বহু মানুষ অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত বাণিজ্য, গরু আনা-নেয়া বা ছোটখাটো চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
গবেষকরা বলছেন, এই বাস্তবতাকে “অপরাধ দমন” নয়, বরং সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট হিসেবেও দেখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিএসএফের অভিযানে বহু ক্ষেত্রে গ্রেফতার বা সতর্কতার বদলে সরাসরি গুলি চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে ২০১১ সালের ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ড।
কুড়িগ্রাম সীমান্তে কাঁটাতার পার হওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় ১৫ বছর বয়সী ফেলানী। পরে তার মরদেহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে থাকার ছবি বিশ্বমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি বাংলাদেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য খালাস পেয়ে যায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই বিচারহীনতাই সীমান্ত হত্যার অন্যতম বড় কারণ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে “দায়মুক্তির সংস্কৃতি”কে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটি বলছে, সীমান্তে হত্যার অভিযোগে বিএসএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত বা বিচার খুব কমই হয়েছে। অধিকাংশ ঘটনায় বিএসএফের অভ্যন্তরীণ তদন্তেই সদস্যরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়। ফলে বাহিনীর মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে সীমান্তে গুলি চালালেও বাস্তবে কোনো জবাবদিহি করতে হবে না।
ভারতীতের পশ্চিমবঙ্গ ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (এমএএসইউএম-১) সীমান্তে বিএসএফের আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। সংগঠনটির গবেষকরা বলছেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম “সামরিকীকৃত সীমান্তে” পরিণত হয়েছে। কাঁটাতার, নজরদারি, অস্ত্রসজ্জিত টহল ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সীমান্তবাসীর স্বাভাবিক জীবনও নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা কিরিটি রায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সীমান্তে মানুষ হত্যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। আইন প্রয়োগের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করতে হবে। ভারত ও বাংলাদেশের যৌথভাবে মানবাধিকারভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত হত্যার পেছনে শুধু নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক বার্তাও কাজ করে। ভারতের অভ্যন্তরে “অনুপ্রবেশ” ইস্যু বহু বছর ধরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হয়েছে। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর প্রভাব সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নীতিতেও পড়ে বলে মনে করেন গবেষকরা। ফলে সীমান্তে কঠোরতা প্রদর্শনকে অনেক সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাফল্য হিসেবে দেখা হয়।
তবে ভারত সরকার বরাবরই বলে আসছে, বিএসএফ আত্মরক্ষার্থে বা চোরাচালানকারীদের সহিংস প্রতিরোধের মুখে গুলি চালাতে বাধ্য হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, সীমান্তে গরু পাচার ও সংঘবদ্ধ চোরাচালান বড় নিরাপত্তা সমস্যা। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, আইন প্রয়োগের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সীমান্তবাসীর অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ।
অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও আহতদের উদ্ধার করতে দেয়া হয়নি। কোথাও কোথাও লাশ ফেরত পেতেও দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। এমনকি বিএসএফের হাতে নির্যাতন, আটক ও নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত হত্যা দুই দেশের সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে অর্থনীতি, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ঘনিষ্ঠ হলেও সীমান্ত হত্যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে। প্রতি বৈঠকেই বিষয়টি উঠলেও কার্যকর সমাধান দৃশ্যমান নয়।
২০১১ সালে দুই দেশ “নন-লেথাল ওয়েপন” বা প্রাণঘাতী অস্ত্রের বদলে বিকল্প ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করেছিল। পরে কয়েকবার বিএসএফও দাবি করে যে তারা রাবার বুলেট ও কম প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে জোর দিচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এখনও গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
মানবাধিকার গবেষকরা বলছেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন তদন্ত, দায়ীদের বিচার, সীমান্তবাসীর অর্থনৈতিক বিকল্প সৃষ্টি এবং দুই দেশের যৌথ মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। অন্যথায় “শূন্য হত্যা” কেবল বৈঠকের কাগুজে প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশের সীমান্তে প্রতিদিন যে গুলির শব্দ শোনা যায়, তা শুধু একটি সীমান্ত বিরোধের গল্প নয়। এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের সংঘাতের প্রতীক। কাঁটাতারের দুই পাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের কাছে সীমান্ত এখন নিরাপত্তার নয়, বরং আতঙ্কের নাম।
আর প্রতিটি নতুন মৃত্যু প্রশ্ন তোলেকত প্রতিবেদন, কত কূটনৈতিক বৈঠক, কত আন্তর্জাতিক উদ্বেগের পর থামবে এই মৃত্যুর মিছিল? মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে সীমান্ত হত্যা এখন একটি মানবাধিকার সংকট। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো দায়মুক্তি। এত হত্যাকাণ্ডের পরও কার্যকর বিচার না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রও (আসক) সীমান্তের হত্যাকান্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায় কোনও ব্যক্তি সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করলে কিংবা চোরাচালান বা অন্য কোনও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের সুযোগ রয়েছে।
বিচারবহির্ভূতভাবে সরাসরি গুলি করে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পৃথিবীর বহু দেশের সীমান্তে অনিয়মিত প্রবেশ বা সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগকে সাধারণ বা গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে দেখা যায় না। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী জীবন রক্ষার বাধ্যবাধকতা সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক আলোচনায় সীমান্ত হত্যা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত এবং মানবাধিকারসম্মত আচরণ নিশ্চিত করতে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
পাশাপাশি ভারতের মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর প্রতিও আসক আহ্বান জানিয়েছে তারা যেন সীমান্তে সরাসরি গুলি করে হত্যার মতো অমানবিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগ বন্ধে নিজ নিজ সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ ও জনমত তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের স্বার্থে সীমান্তে হত্যা বন্ধ হওয়া জরুরি। সীমান্ত কখনোই মানুষের জীবনহানির ক্ষেত্র হতে পারে না। বরং তা হওয়া উচিত আইনের শাসন, মানবিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রতিফলন।
আ.দৈ/আরএস




















