ছড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং
পরিবার ভাঙন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় বাড়ছে কিশোর অপরাধ
শাহীন রহমান

রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা শহর বাংলাদেশে দ্রুত বিস্তার ঘটছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির। একসময় বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত কিশোর অপরাধ এখন অনেক জায়গায় সংগঠিত রূপ নিয়েছে।নামসর্বস্ব গ্রুপ, টিম বা স্কোয়াড” গড়ে তুলে কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, কিশোর নির্যাতন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সহিংসতা এমনকি হত্যাকাণ্ডেও।
সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণা বলছে, এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; বরং পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও ডিজিটাল সংস্কৃতির গভীর সংকটের বহুমাত্রিক প্রতিফলনই কিশোর অপরাধ গড়ে ওঠার পেছনে মুল দায়ি।
সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা ও স্বস্তি ফেরাতে কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে রাজধানীতে নজরদারি বাড়িয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এর অংশ হিসেবে মহানগরীতে আরও ১১ হাজার সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ডিএমপি জানিয়েছে,আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে ব্লক রেইড অভিযান, পুলিশি টহল, বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
ডিএমপি’র ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, নজরদারি বাড়াতে ঢাকা মহানগরীতে ১১ হাজার সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা করা হবে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস ও ছিনতাই ঠেকাতে ৭শ’ সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। এগুলো স্থাপন করা হলে এই মহানগর আরও নিরাপদ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ ও রাষ্ট্র সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তারা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের কেবল অপরাধী হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের বড় অংশই সামাজিক অবহেলা, মানসিক সংকট ও পারিবারিক অস্থিরতার শিকার। তাই শাস্তির পাশাপাশি পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তাও জরুরি। দেশজুড়ে কিশোর গ্যাং বিস্তারের এই প্রবণতা এখন শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের নগর সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতার এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। গবেষকেরা বলছেন, পরিবার ও সমাজ যদি এখনই কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তবে আগামী প্রজন্মের একটি অংশ আরও গভীর সহিংসতা ও অপরাধের চক্রে আটকে পড়তে পারে।
ঢাকাকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়া অধিকাংশ কিশোরের বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। এদের বড় একটি অংশ স্কুলছুট অথবা অনিয়মিত শিক্ষার্থী। অনেকের পরিবার ভাঙনের মুখে, বাবা-মা আলাদা থাকেন কিংবা দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকার কারণে সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত নজরদারি থাকে না। গবেষকেরা বলছেন, পরিবারের শূন্যতা এখন কিশোর গ্যাং বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ফ্যাক্টরস অব জুভেনাইল গ্যাং কালচার ইন বাংলাদেশ: অ্যান ইনভেস্টিগেটিভ স্টাডি ইন ঢাকা শীর্ষক গবেষণায় ঢাকার কয়েকটি এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। সেখানে দেখা যায়, অধিকাংশ কিশোর গ্যাং সদস্য প্রথমে বন্ধুদের মাধ্যমে গ্রুপে যুক্ত হয়। শুরুতে আড্ডা, মোটরসাইকেল শোডাউন, টিকটক ভিডিও তৈরি কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দল গড়ে উঠলেও পরে তা অপরাধচক্রে পরিণত হয়। গবেষণাটিতে বলা হয়, “গ্রুপ পরিচয়” ও ক্ষমতার অনুভূতি অনেক কিশোরকে আকৃষ্ট করছে।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, উত্তরা, বাড্ডা ও নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিশোর গ্যাং সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের আলাদা পরিচিতি তৈরি করছে। ফেসবুক গ্রুপ, মেসেঞ্জার চ্যাট কিংবা টিকটক লাইভে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক সময় বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। ছোটখাটো বিরোধও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে “গ্যাং দ্বন্দ্বে” পরিণত হচ্ছে।
গবেষকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি “ভার্চুয়াল গ্যাং সংস্কৃতি” তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। কিশোরদের অনেকেই সিনেমা, ওয়েব সিরিজ বা বিদেশি গ্যাং সংস্কৃতি অনুকরণে আগ্রহী হয়ে উঠছে। নিজেদের “ভয়ংকর” হিসেবে তুলে ধরতে তারা ধারালো অস্ত্র হাতে ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করছে। এতে নতুন কিশোররাও আকৃষ্ট হচ্ছে।
এছাড়া জুভেনাইল গ্যাংস ইন বাংলাদেশ: আ ক্রিমিনোলজিক্যাল রিভিউ উইথ ইমপ্লিকেশনস ফর ফ্যামিলি স্ট্রেনথেনিং অ্যান্ড ইউথ ওয়েলফেয়ার শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, কিশোর গ্যাং বিস্তারের পেছনে সামাজিক বৈষম্য ও হতাশাও বড় কারণ। নিম্নআয়ের পরিবারের কিশোররা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎহীনতায় ভোগে। আবার মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক কিশোর মানসিক নিঃসঙ্গতা, পারিবারিক দূরত্ব ও সামাজিক চাপ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। গবেষণাটি বলছে, পরিবারে মানসিক সংযোগ কমে যাওয়া” কিশোরদের বিকল্প পরিচয় খুঁজতে বাধ্য করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে জীবনে খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়াও বড় সমস্যা। নগরায়ণের চাপে শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। স্কুল শেষে সময় কাটানোর মতো নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ না থাকায় অনেকে রাস্তাকেন্দ্রিক গ্রুপে জড়িয়ে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা নিজেদের “এলাকার নিয়ন্ত্রক” হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। এতে তারা স্থানীয়ভাবে একধরনের প্রভাব ও পরিচিতি পায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা, পোস্টার লাগানো, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো কিংবা মাদক পরিবহনের মতো কাজে কিশোরদের ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে কিশোরদের মধ্যে অপরাধকে “সহজ ক্ষমতার পথ” হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে।
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, স্কুলব্যবস্থার ভেতরেও পরিবর্তন এসেছে। আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি শক্তিশালী জায়গা ছিল। এখন অনেক শিক্ষার্থী অনলাইনে বেশি সময় কাটায়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কও আগের মতো ঘনিষ্ঠ নয়। স্কুলে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় মানসিক সমস্যায় থাকা কিশোরদের দ্রুত শনাক্ত করা যায় না। ফলে তারা সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ বন্ধুবৃত্তে জড়িয়ে পড়ে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোর এমন একটি সময় যখন স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্খা খুব প্রবল থাকে। পরিবার, স্কুল বা সমাজে সেই স্বীকৃতি না পেলে কিশোররা বিকল্প জায়গায় তা খুঁজতে যায়। গ্যাং তাদের কাছে বন্ধুত্ব, সাহস ও পরিচয়”-এর প্রতীক হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বুঝতেই পারে না কখন আড্ডা অপরাধে রূপ নিচ্ছে।
গবেষণাগুলোতে আরও বলা হয়েছে, মাদক সহজলভ্য হওয়াও কিশোর গ্যাং বিস্তারের বড় কারণ। অনেক এলাকায় গ্যাং সদস্যরা মাদক বহন, বিক্রি বা সেবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের অর্থ জোগাতে তারা ছিনতাই বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধেও জড়িয়ে যায়। কিছু এলাকায় মোটরসাইকেল গ্যাংয়ের মাধ্যমেও কিশোর অপরাধ বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ, কিশোর বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়া অনেকেই পরবর্তীতে বড় অপরাধচক্রের অংশ হয়ে যায়। ফলে এটি ভবিষ্যতের সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের কেবল অপরাধী” হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের বড় অংশই সামাজিক অবহেলা, মানসিক সংকট ও পারিবারিক অস্থিরতার শিকার। তাই শাস্তির পাশাপাশি পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তাও জরুরি। দেশজুড়ে কিশোর গ্যাং বিস্তারের এই প্রবণতা এখন শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের নগর সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতার এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। গবেষকেরা বলছেন, পরিবার ও সমাজ যদি এখনই কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তবে আগামী প্রজন্মের একটি অংশ আরও গভীর সহিংসতা ও অপরাধের চক্রে আটকে পড়তে পারে।
আ. দৈ./কাশেম/ এস রহমান




















