সরকারের প্রথম বাজেটে সংকট মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে
শাহীন রহমান॥

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের চাপ ও রাজস্ব সংকটের মধ্যেই নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৮ লাখ ২০ হাজার কোটি থেকে ৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় এবার বড় ধরনের ‘উচ্চাভিলাষী’ বাজেটের বদলে সংকট মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেয়া হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন বলছেন, এবারের বাজেট হবে মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার বাজেট। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং কমে যাওয়া রাজস্ব প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা মাথায় রেখেই ব্যয়ের পরিকল্পনা সাজাতে হচ্ছে সরকারকে।
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন বসতে যাচ্ছে আগামী ৭ জুন। ওই দিন বেলা তিনটায় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এটি হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। এই অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ৭ জুন রোববার বেলা তিনটা থেকে জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট) অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
১১ জুন অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ করতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে আসন্ন জাতীয় বাজেটকে “বড় চ্যালেঞ্জ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে সরকারকে নতুন বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই বাজেট সাজানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাজেটে ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ব্যয় কমানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বিদেশি ঋণনির্ভর বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রাধিকারভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের বরাদ্দ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী সহায়তা, ভিজিএফ ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হবে। একই সঙ্গে খাদ্য মজুত ও আমদানি ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি গুরুত্ব দেয়া হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সরাসরি নগদ সহায়তা ও খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে হতে পারে। কারণ বর্তমানে শহর ও গ্রাম দুই এলাকাতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় বড় চাপ তৈরি করেছে।
করোনার অভিজ্ঞতার পর স্বাস্থ্য খাতকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় এবং চিকিৎসক সংকট মোকাবিলায় বাড়তি বরাদ্দ থাকতে পারে। স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানোর আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল শিক্ষা অবকাঠামো এবং স্মার্ট শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া হতে পারে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তাই এবারের বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়ার দাবি উঠেছে।
রাজস্ব আদায়ে বড় চ্যালেঞ্জ॥ বিশেষজ্ঞরা বলছেন এবারের বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম বড় বাধা হতে পারে রাজস্ব ঘাটতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। আমদানি কমে যাওয়া এবং শিল্প খাতে ধীরগতির কারণে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত নয়। এ পরিস্থিতিতে সরকার নতুন করে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণে জোর দিতে পারে। অনলাইন ট্যাক্স রিটার্ন, ই-ভ্যাট এবং ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে আমদানি শুল্ক বা ভ্যাট বাড়ানো হলে বাজারে পণ্যমূল্য আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে।
ব্যাংক ঋণ ও বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা॥ বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে আবারও ব্যাংক ঋণ ও বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ ঋণ বেশি নেয়া হলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপও বাড়ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে আরও সতর্ক হতে হবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত না হলে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাই বাজেটে আর্থিক খাত সংস্কারের দিকনির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কর্মসংস্থান ও শিল্প খাতে গুরুত্ব॥ তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও এবারের বাজেটে গুরুত্ব পেতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহজ ঋণ, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ থাকতে পারে। রপ্তানি আয় বাড়াতে তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও আইটি খাতে নতুন প্রণোদনার কথাও ভাবা হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের জন্য প্রণোদনা অব্যাহত থাকতে পারে।
বাস্তবমুখী বাজেটের প্রত্যাশা॥ অর্থনীতিবিদদের মতে, এবার সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চাভিলাষী ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য ও কার্যকর বাজেট উপস্থাপন করা। তাঁরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানো এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই বাজেট সাজাতে হবে। সব মিলিয়ে, নতুন অর্থবছরের বাজেট হতে যাচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি বড় পরীক্ষা। বাজেটের আকার বাড়লেও সরকারের মূল লক্ষ্য থাকবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা হলেও কমানো।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন বড় বাজেট দিলেই যে অর্থনীতিতে গতি আসবে, তা নয়। গত কয়েক বছর ধরেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজস্ব ঘাটতি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এবারের বাজেটে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া হতে পারে। সরকার একদিকে বড় অবকাঠামো প্রকল্প চালিয়ে যেতে চাইবে, অন্যদিকে ব্যয় সংকোচনের চাপও থাকবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতোমধ্যে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। ফলে অপ্রয়োজনীয় সরকারি খরচ কমানোর উদ্যোগ থাকতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হবে বড় চ্যালেঞ্জ॥ দেশে দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় বড় চাপ তৈরি করেছে। এ কারণে এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়তে পারে। নিম্ন আয়ের মানুষকে সহায়তা দিতে খাদ্য সহায়তা, ভিজিএফ, ভিজিডি ও নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে গুরুত্ব বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি সহজ করা, কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানো এবং বাজার তদারকির ওপরও জোর থাকতে পারে।
কর বাড়বে নাকি বাড়বে করের আওতা॥ সরকারের অন্যতম বড় সংকট রাজস্ব আদায়। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। তাই এবারের বাজেটে নতুন কর আরোপের বদলে করের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা, অনলাইন রিটার্ন এবং ই-ভ্যাট ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে পারে। একই সঙ্গে কিছু খাতে কর ছাড় কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে ব্যবসায়ী মহল আশঙ্কা করছে, আমদানি পর্যায়ে শুল্ক বৃদ্ধি বা জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ হলে বাজারে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। ফলে সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ব্যাংক খাত ও ডলারের সংকট গুরুত্ব পাবে॥ দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকট এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। ডলারের চাপের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, শিল্প খাতেও প্রভাব পড়ছে। এবারের বাজেটে রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য কিছু প্রণোদনা অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় বাড়াতে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত না হলে শুধু বাজেট দিয়ে অর্থনীতির চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
রাজনৈতিক বাস্তবতাও প্রভাব ফেলবে॥ অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তবতাও বাজেটে প্রভাব ফেলবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি সরকার দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেট হবে এক ধরনের ভারসাম্যের পরীক্ষা। একদিকে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ,দুই দিক সামলেই সরকারকে বাজেট তৈরি করতে হবে। সব মিলিয়ে, এবারের জাতীয় বাজেট থেকে বড় ধরনের চমক কম, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও সংকট মোকাবিলার বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ বেশি দেখা যেতে পারে।
আ. দৈ./কাশেম/ এস রহমান




















