প্রতি বছরই আগাম বন্যা ফসলের ক্ষতি হচ্ছে ৩০শতাংশ পর্যন্ত: গবেষণায় উদ্বেগ
ধারাবাহিক দুর্যোগে ঝূকিপুর্ণ হয়ে পড়ছে হাওরের কৃষি ব্যবস্থা
শাহীন রহমান॥

আকস্মিক বন্যায় দেশের অধিকাংশ হাওরই পানিতে থইথই করছে; এর নিচে রয়েছে কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধান। কোথাও কোথাও কৃষক কিছু ধান কাটতে পেরেছেন। কিন্তু রোদ না থাকায় সেই ধানই খলায় পড়ে চারা গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে। ক্ষতি কমাতে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কাঁচা ধানই সেদ্ধ করছেন। এই অঞ্চলের একমাত্র ফসল বোরোধান হারিয়ে কৃষখ অনেকটা দিশেহারা। এবার বৃষ্টি ও ঢলে সাত জেলায় ৪৬ হাজার ৭৩০ হেক্টরের বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে।
ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর। এখনো এক লাখ ৩০ হাজার ৮১২ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়নি এবং প্রায় সবই পানির নিচে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এবারের বন্যায় প্রায় এক-চতুর্থাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার নয় আকস্মিক বন্যায় প্রতিবছর এলাকায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বন্যায় নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী কোন সমাধান নেয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারাবাহিক দুর্যোগ হাওরের কৃষি ব্যবস্থাকে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে প্রায় প্রতি বছরই আগাম বন্যা আঘাত হানছে এবং এতে গড়ে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বোরো ধানের ক্ষতি হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যার সময় ক্রমেই এগিয়ে আসছে, ফলে ধান কাটার আগেই বিস্তীর্ণ ফসল পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষকের একমাত্র আয়ের উৎস মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন হাওর অঞ্চলে কৃষি উৎপাদনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আগাম বন্যা। সাধারণত মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে এই বন্যা দেখা দেয়, যখন বোরো ধান কাটার সময় ঘনিয়ে আসে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকরা ফসল ঘরে তোলার আগেই পুরো জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এতে এক মৌসুমেই তাদের পুরো বছরের আয় হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। গবেষণা বলছে, হাওর অঞ্চলের কৃষি প্রায় সম্পূর্ণভাবে এক ফসল বোরো ধানের ওপর নির্ভরশীল। এই একমুখী কৃষি ব্যবস্থার কারণে ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে। কারণ একবার ফসল নষ্ট হলে কৃষকদের বিকল্প আয়ের সুযোগ খুবই সীমিত থাকে। এছাড়া এই অঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক কম যেখানে জাতীয় গড় প্রায় ১৯৫ শতাংশ, সেখানে হাওরে তা মাত্র ১০৪ শতাংশ।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল বছরের প্রায় অর্ধেক সময় পানির নিচে থাকে এবং প্রায় প্রতি বছরই আগাম বন্যার কবলে পড়ে কৃষি উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, এই অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় একদিকে রয়েছে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে রয়েছে উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনাও। দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৪ শতাংশজুড়ে বিস্তৃত হাওর যা একটি বিশেষ ধরনের নিম্নভূমি জলাভূমি ।
এই অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষের বসবাস, যাদের জীবিকা মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে বছরের বড় একটি সময়—বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চল সম্পূর্ণ পানিতে নিমজ্জিত থাকে, যা কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। ফলে এবারের ক্ষতি জাতীয় উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে, যদিও কৃষি বিভাগ মনে করছে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধাক্কা না-ও লাগতে পারে।
কনস্ট্রেইন্টস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ অব অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ইন হাওর ইকোসিস্টেম অব বাংলাদেশ শীর্ষক আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, হাওর অঞ্চলকে দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে আকস্মিক বন্যা (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) সবচেয়ে বেশি ঘটে, যা বোরো ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে আঘাত হানে।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা ফসল ঘরে তোলার আগেই সম্পূর্ণ ক্ষতির মুখে পড়েন। গবেষণা অনুযায়ী, গত দুই দশকে হাওর অঞ্চলে প্রায় প্রতি বছরই বড় বা মাঝারি ধরনের বন্যা দেখা গেছে। এর মধ্যে কিছু বছর বিশেষ করে ২০১৭, ২০১৯ এবং ২০২২ সালে বন্যার তীব্রতা ছিল অত্যন্ত বেশি, যা লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারাবাহিক দুর্যোগ হাওরের কৃষি ব্যবস্থাকে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে তুলেছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, হাওরের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কৃষিজমি বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। যেহেতু এই অঞ্চলে মূলত এক ফসলি কৃষি ব্যবস্থা বিশেষ করে বোরো ধানের ওপর নির্ভরতা তাই একবার ফসল নষ্ট হলে কৃষকের পুরো বছরের আয় বন্ধ হয়ে যায়। এতে ঋণগ্রস্ততা, খাদ্য সংকট এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য আরও বাড়ে। স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতাও গবেষণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তারা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় এখন বন্যা আগেই চলে আসে এবং পানির উচ্চতাও দ্রুত বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে রাতারাতি ক্ষেত ডুবে যায়, ফলে ফসল রক্ষা করার কোনো সুযোগ থাকে না।
গবেষণায় হাওর অঞ্চলের কৃষি ক্ষতির পেছনে কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল বা অপ্রতুল বাঁধ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত পানি নিয়ন্ত্রণ, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো বাঁধ মেরামত ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এছাড়া গবেষণায় কৃষি বৈচিত্র্য আনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু বোরো ধানের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প ফসল, মৎস্য চাষ এবং অন্যান্য জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এতে কৃষকের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওর অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে কৃষি উৎপাদন টেকসই রাখা এবং স্থানীয় জনগণের জীবিকা সুরক্ষিত করা সম্ভব হয়। গবেষকরা বলছেন, সমন্বিত পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ।
সব মিলিয়ে, হাওর অঞ্চলের কৃষি এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রতি বছরের আগাম বন্যা এবং নিয়মিত ফসল ক্ষতি শুধু কৃষকদের নয়, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রতিকূলতার মধ্যেও হাওর অঞ্চলে কৃষি উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি ও ঠান্ডা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং দ্রুত কাটার উপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আগাম বন্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে গবেষণায়। বর্তমানে ধান রোপণ থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত বিভিন্ন যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, যা শ্রম সংকট মোকাবিলা এবং সময়মতো ফসল ঘরে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। গবেষণায় হয়েছে, হাওর অঞ্চলে কৃষির পাশাপাশি মাছ চাষ, পশুপালন এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এতে কৃষকদের ঝুঁকি কমবে এবং সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওর অঞ্চলের উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে বন্যার তীব্রতা ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাওর অঞ্চলের কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। সব মিলিয়ে, হাওর অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এটি দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, হাওরে বন্যার প্রকোপ মে মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ এবং এপ্রিলের শেষভাগে প্রায় ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ আগাম ফসল ঘরে তুলতে পারলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। অধ্যাপক হাবিবুর রহমান প্রামাণিকের নেতৃত্বে গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্পমেয়াদি জাত যেমন ব্রি ধান-৮৮, ১০১, ১১৩ ও ১০৫-১৪০ থেকে ১৪৫ দিনে পাকে, যা প্রচলিত ১৬০ দিনের জাতের তুলনায় ১৫-২০ দিন আগে কাটা সম্ভব।
তবে ফলন কিছুটা কম হওয়ায় কৃষকেরা এসব জাত গ্রহণে অনীহা দেখান। ধান বিজ্ঞানী ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, হাওরের জন্য এমন জাত প্রয়োজন, যা কয়েক দিন পানির নিচে থাকলেও ক্ষতি কম হয়। পাশাপাশি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ-কম্বাইন হারভেস্টার ও রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আ. দৈ./কাশেম / এস রহমান




















