কোরবানির পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি
বিশেষ প্রতিনিধি

প্রাণিসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে প্রায় সোয়া কোটি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। গত বছর দেশে ১ কোটি ২৪ লাখ পশু প্রস্তুত থাকলেও কোরবানি হয়েছে প্রায় ৯১ লাখ। ফলে প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত থাকছে। এবারও চাহিদার তুলনায় সবরাহ বেশি বলে জানিয়েছে প্রাণী সম্পদ অদিদফতর। প্রতিষ্ঠাটির কর্মকর্তারা জানিয়েছে গত বছরের মতো এবারো দেশের বাইরে থেকে কোনো গরু আমদানি করতে দেয়া হবে না। এজন্য আগেভাগেই সীমান্তের হাটগুলোর ইজারা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ গবাদি পশু রয়েছে। আমদানির প্রয়োজন নেই। কোরবানির পশুর দামও সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। তিনি জানান, এ বছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে এক কোটি ২৪ লাখেরও বেশি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত আছে। রোববার সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, গত বছরের মতো এবারো দেশের বাইরে থেকে কোনো গরু আমদানি করতে দেয়া হবে না। এজন্য আগেভাগেই সীমান্তের হাটগুলোর ইজারা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা শহরে ২৭টিসহ সারাদেশে তিন হাজার ছয় শ’র বেশি গরুর হাট বসবে। ঢাকায় ২৭টির মধ্যে উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১১টি হাট বসবে। ঢাকা শহরে নির্দিষ্ট জায়গায় হাট বসবে। রাস্তাঘাটে যান চলাচল বিঘ্ন ঘটিয়ে কোনো হাট বসতে দেয়া হবে না। আমিন উর রশিদ বলেন, গরু মোটাতাজাকরণের জন্য অতীতেও সরকারিভাবে কোনো ইনজেকশন আমদানির অনুমতি দেয়া হয়নি। এবারো এ ধরনের ইনজেকশন আমদানির অনুমতি দেয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, অনলাইনে গরু বেচাকেনায় কোনো খাজনা দিতে হবে না। যারা সরাসরি হাট থেকে গরু কিনবেন, শুধু তাদেরই হাসলি বা খাজনা দিতে হবে। মন্ত্রী বলেন, কোরবানির পশুর প্রতিটি হাটে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিম থাকবে, যাতে কোনো পশু অসুস্থ হয়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসা দেয়া যায়। তিনি আরো বলেন, সড়ক ও নৌ পথে কোবানির গরু বহনকারী যানবাহনে কোনো চাঁদাবাজি হতে দেয়া হবে না। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া আছে। সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মন্ত্রণালয়ের সচিব দেলোয়ার হোসেনসহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে দেশে কোরবানির পশু উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খামারিরা দেশীয়ভাবে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়েছেন। এর ফলে আমদানিনির্ভরতা কমে গিয়ে বাংলাদেশ এখন প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল। তবে কোরবানি হয়েছে প্রায় ৯১ লাখ পশু। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু অবিক্রীত থেকে যায়, যা খামারিদের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করে। এ বছরও একই প্রবণতা দেখা যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে খাদ্য ও পশুপালন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বাজারে ক্রেতার সংখ্যা ও ক্রয়ক্ষমতা আগের মতো না থাকলে পশুর দাম কমে যেতে পারে।
খামারিরা বলছেন, তারা সারা বছর ধরে পশু লালন-পালনে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু ঈদের বাজারে যদি ন্যায্য দাম না পান, তাহলে লোকসানের মুখে পড়তে হয়। অন্যদিকে, ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামে পশু কিনতে পারলে স্বস্তি পেতে পারেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দেশে কোরবানির পশুর উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে সরকারি প্রণোদনা, উন্নত জাতের পশু পালন এবং খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনা, অনলাইন পশু বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ এবং খামারিদের জন্য ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পশু প্রবেশ নিয়ন্ত্রণেও নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছে সব মিলিয়ে, দেশে কোরবানির পশু উৎপাদনে ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও বাজার ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে খামারি ও ভোক্তা—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আ. দৈ./কাশেম/ এস রহমান




















