ডিএনসিসিতে ৩৪৮টি উন্নয়ন কাজের মান যাচাইয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীদের নির্দেশ প্রশাসকের
বর্তমান প্রশাসক শফিকুলকে বেকায়দায় ফেলতে আতিক ও এজাজের সিন্ডিকেট ফের সক্রিয়
আবুল কাশেম:

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোঃ শফিকুল ইসলাম খানকে পরিকল্পিত ভাবে বেকায়দায় ফেলতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং ওই সরকার পতনের পর প্রশাসকের দায়িত্বে আসা মোহাম্মদ এজাজের রেখে যাওয়া শক্তিশালী সিন্ডিকেট ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা ‘আজকের দৈনিক’পত্রিকাকে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ ডিএনসিসিতে উন্নয়নমূলক কাজের মান নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। এমনও অভিযোগ উঠেছে কাজ শেষ হবার আগেই ঠিকাদারদের তৈরি করা বিল পরিশোধের সুপারিশ করতেন আঞ্চলিক কার্যালের সংশ্লিষ্ট উপ সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ডিএনসিসিতে অনেক উন্নয়ন মূলক কাজের টেন্ডার আহবান, সাজানো টেন্ডারে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজটি আবার আরেক পছন্দের ঠিকাদারের কাছে অগ্রীম কমিশন নিয়ে বিক্রির বিষয়গুলো বেশ আলোচিত। বলতে গেলে ডিএনসিসিতে এসব অভিযোগের যেন শেষ নেই। প্রশাসকের দপ্তর থেকে আঞ্চলিক কার্যালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিকাংশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্ধারিত হারে কমিশন (পারসেনন্টিস) ভাগাভাগির বিষয়টি ওপেন সিক্রেট।বলতেগেলে ডিএনসিসিতে এখনো কিছু সৎ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা আছেন। তবে তাদের সংখ্যা কম। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশ প্রকৌশলী এবং কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই মোটা অংকের কমিশন ভাগাভাগির অভিযোগ আগে থেকেই আছে। কারণ ডিএনসিসিতের মেয়র এবং প্রশাসক পরিবর্তন হবার সাথে সাথে আগের সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী সদস্যরা কিছু দিন চুপচাপ থাকার পর অবস্থা বুঝে পুনরায় ওই সিন্ডিকেট নবায়ন করেন।
ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা আরো জানান,বর্তমান প্রশাসক মোঃ শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব গ্রহণের পর পৃথক আদেশে দুর্নীতি,ক্ষমতার অপব্যহার,স্বজনপ্রীতি,তহবিল তসরুপ এবং অসদাচারণের সুনিদিষ্ট অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমানকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।এরমধ্যে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে শুধুমাত্র ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের পর বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো.আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে এখনো বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়নি। শুধু তাইনয়, ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শে এবং সহযোগিতায় চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ (সাময়িক বরখাস্ত) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো.আরিফুর রহমানকে বিরুদ্ধে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই তদন্ত কমিটির তিনজন হলেন, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর,প্রধান সমাজ কল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান, ডিএনসিসির প্রশাসকের একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।
এই তিনজনের কেউ অতীতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনলাইন ( ইজিপি) টেন্ডার সংক্রান্ত কাজের বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা নেইবলে জানা যায়। তাই যদি হয়, হলে কার স্বার্থে এবং কেনো এই তিন কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া আরো প্রশ্ন উঠেছে, ডিএনসিসির সাবেক মেয়র মো.আতিকুল ইসলামের আমলে নিয়োজিত তার একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে এখনো ওই পদে বহাল তবিয়তে রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং দুর্নীতিবাজ মেয়র আতিকুল ইসলাম নগর ভবন থেকে পালিয়ে যান। এর পর একাধিক প্রশাসক ডিএনসিসিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
মেয়র আতিকের পর প্রশাসক এজাজের দপ্তরের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সেদস্যরা নিজেদের স্বার্থেই প্রধান সমাজ কল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান এবং একান্ত সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ আবদুল্লাহদের ধরে রেখেছেন। অথচ ইতোমধ্যে ডিএনসিসির বেশ কিছু কর্মকর্তাকে এই সংস্থায় যোগদানের এক/ দেড় বছরের মাথায় সরিয়ে দেওয়ার নজির রয়েছে। এসব প্রশ্ন ডিএনসিসিতে বেশ আলোচিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানকে বেকায়দায় ফেলতেই আগের প্রশাসকের সিন্ডিকেট প্রথমেই ২৬ টি অ্যাকাউন্টে এফডিআরসহ বিপুল অর্থের গোজামিলের হিসেব গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করেন। ডিএনসিসির বাজেটের কখনো এফডিআর-এ সংরক্ষিত অর্থ বাদ দিয়েই বার্ষিক আয় এবং ব্যয়ের খাত উল্লেখ করা হয়। বর্তমান প্রশাসক যখন প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন ডিএনসিসির ফান্ডে মাত্র ২৫ কোটি টাকা আছে। প্রতিমাসে বেতনে খরচ হয় প্রায় ১৩ কোটি টাকা। ঠিক সেই মূহুর্তে ডিএনসিসিতে আগের প্রশাসক এজাজ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জানান দিলেন, তিনি প্রায় ১৩ শত কোটি টাকা রেখেগেছেন। এরপরই পুরো বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্তমান প্রশাসকের বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য শুরু হয়। এখানেও রহস্যজনক কারণে ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিরব রয়েছেন। ।

এদিকে নগরীতে চলমান সব উন্নয়নমূলক কাজের মান নির্বাহী প্রকৌশলীদের সশরীরে উপস্থিত হয়ে যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের চলমান কাজের মান নিশ্চিত করতে নির্বাহী প্রকৌশলীদের স্ব স্ব এলাকায় ফিল্ডে উপস্থিত থেকে কাজের গুণগত মান যাচাই করতে হবে।
প্রশাসক ঠিকাদারদের উদ্দেশ্যে বলেন, সব কাজ নির্ধারিত সময়সূচির মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। যথাসময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিম্নমানের কোনো কাজ পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা চিহ্নিত করে পুনরায় যথাযথভাবে কাজ আদায় করে নিতে হবে।
আজ সোমবার (৩০ মার্চ) বিকেলে নগর ভবনে ঢাকা উত্তর সিটিতে চলমান সকল উন্নয়নমূলক কাজের অগ্রগতি, গুণমান ও গতিশীলতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ঠিকাদারদের সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রশাসক এসব কথা বলেন। প্রশাসক আরও বলেন, ডিএনসিসি ও ঠিকাদারদের মধ্যে কার্যকর বোঝাপড়া থাকতে হবে। “আমরা কাউকে বাদ দিয়ে কাজ করতে চাই না। আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর, আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে চাই,”। তিনি বলেন, কাজের ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের তুলনায় ডিএনসিসিকে অগ্রগামী থাকতে হবে এবং কাজের ক্ষেত্রে কারও প্রতি কোনো বৈষম্য করা হবে না।
সভায় জানানো হয়, ঢাকা উত্তর সিটিতে বর্তমানে ৩৪৮টি উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। এসব কাজের আওতায় ২১৫.৬৫ কিলোমিটার রাস্তা, ২১৫.১৩ কিলোমিটার নর্দমা এবং ৬৭.৫৯ কিলোমিটার ফুটপাত উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। সভায় বিভিন্ন ঠিকাদার তাদের কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে সেসব সমস্যার সমাধানে ডিএনসিসির সহায়তা কামনা করেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান,সভায় ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীখন্দকার মাহবুব আলম,অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী-১ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খন্দকার মাহবুব আলম,অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী-২ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোঃ রফিকুল ইসলাম,তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক সার্কেল) আবুল হাসনাত মোঃ আশরাফুল আলম,তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিবেশ, জলবায়ু ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল) মোহাম্মদ আবুল কাশেম,তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সিভিল সার্কেল ফারুক হাসান মোঃ আল মাসুদ,তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগএস.এম.শফিকুর রহমান এবং নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ডিএনসিসির অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ।
আ. দৈ./কাশেম




















