আটকে আছে অনেক ভিআইপি চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও অর্থ পাচারকারীর বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান, মামলা ও চার্জশিটের সিদ্ধান্ত
দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার আলোচনায় সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেনসহ অনেকের নাম
আবুল কাশেম

ছবিতে-- আলোচনায় শীর্ষে সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেন
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের সমন্বয়ে নতুন কমিশন গঠনের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। একই সাথে কমিশন না দেশের বহুল আলোচিত চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারী এবং অবৈধ সম্পদের মালিক কয়েক শত ভিআইপির দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের অনুসন্ধান, চলমান অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে মামলা ও আগের দায়ের করা চার্জশিটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম আটকে রয়েছে।
বর্তমানে সরকারি এবং আধা সরকারি অফিস ও সেবাখাতের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর করপোরেশনে লাগামহীন ঘুষ,দুর্নীতি,ফ্রি স্টাইলে চলমান লোপাটের লাগাম টেনে ধারা যেন কেউ নেই। এসব বিষয়ে দুদকের ফাঁদ মামলা এবং সরাসরি অভিযান পরিচানা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমের অনুমোদন দেওয়ার কোন কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে সবকিছু আটকে রয়েছে।
এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে একাধিক রাজনৈতিক নেতা জানান, সবার দৃষ্টি এখন দুদকের নতুন চেয়ারম্যান এবং কমিশনারদের নিয়োগের দিকে। কারণ নতুন কমিশনটি বাঘের মতো গর্জন করে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ধারালো নোখ ও দাঁত দিয়ে শিকার করবে। নাকি অতীতের মতো রাজনৈতিক সরকারের নির্দেশনার আলোকে বিশেষ শ্লোগানধারীদের আইনের ফাঁক ফোকড়ে ছেড়ে দেবেন আর অপছন্দের লোকজনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠাবে এবং লঘু অপরাধে গুরু সাজা দিতে হয়রানীর ধারাবাহিকতা শুরু হবে।
সূত্র মতে, দুদকে অষ্টম ও নতুন কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে ইতোমধ্যে আলোচনায় শীর্ষ স্থানে রয়েনে ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেন। ২০১৩ সালে ১৭ নভেম্বর তিনি দুদকের করা অর্থ পাচার মামলায় তারেক রহমানকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) খালাস দিয়ে ছিলেন। এছাড়া আরো অনেকের নাম আলোচনায় রয়েছেন; এরমধ্যে- সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ খন্দকার আবুল হোসেন,এনবিআর’এর সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাত হোসেন ভূঁইয়া, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব এ এইচ এম নুরুল ইসলাম, প্রশাসন ক্যাডারের ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো: আব্দুল্লাহ আল বাকী,সাবেক বিচারক, আমলা,পুলিশ প্রশাসন এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের নাম নিয়ে বেশ জল্পনাকল্পনা চলছে।
সূত্র মতে,ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকারের পতন এবং প্রশাসনিক ব্যাপক পরিবর্তনের পর ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারে পদক্ষেপ নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) ২০২৫ অধ্যাদেশ জারি করে তৎকালীন সরকার। ২০২৫ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশ অনুযায়ী,এখন দুদক সর্বোচ্চ পাঁচ সদস্যের কমিশন হতে পারবে। এতে অন্তত একজন নারী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ একজন সদস্য রাখার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি একজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন। এই সব বিষয় নিয়ে বর্তমান সরকার অনেকটাই দ্বীধা দ্বন্দ্বে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বর্তমান বিএনপি সরকার গঠনের ১৪তম দিনে গত ৩ মার্চ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে দুদকের চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে এই সংস্থাটিতে আর নতুন কমিশন গঠনের বিষয়ে জোর তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। আইন ও বিধি অনুযায়ী অতীতে দেখা গেছে কমিশন শূন্য হবার জন সরকারের পক্ষ থেকে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হতো। ওই সার্চ কমিটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে ৩টি পদের জন্য ৬ জনের নামের প্রস্তাবসহ প্রতিবেদন পাঠাতেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত নতুন কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগের বিষয়ে সার্চ কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়নি। তাহলে সরকার কি সার্চ কমিটি গঠন ছাড়াই দলীয় বিবেচনায় দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও দুই জন কমিশনার নিয়োগ দেবেন। এসব বিষয়নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জুন চলছে।
সূত্র মতে, এরআগে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ, কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক ও কমিশনার (অনুসন্ধান) মোছা. আছিয়া খাতুন পদত্যাগ করেন। এর পর ড. আবদুল মোমেন ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর পাঁচ বছরের মেয়াদে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। এর আগে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব ছিলেন। এরপর একই সাথে দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক বিচারক মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ। দুদক ২০০৪ সালে ২১ নভেম্বর থেকে সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৩ মার্চ পর্যন্ত ৭টি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। এখন অষ্টম কমিশন গঠন করবে সরকার। রাজনৈতিক চাপে বিগত দুদকের ৭ কমিশনের মধ্যে ৫ কমিশনের বিরুদ্ধেই স্বজন প্রীতি ও দায়মুক্তির অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি শুরু হয় দুদকের ড. গোলাম রহমানের নেতৃত্বে তৃতীয় কমিশন থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক ও উপর মহলের চাপে দুদকের ৭ কমিশনের মধ্যে ৫টি কমিশনের বিরুদ্ধেই দায়মুক্তির অভিযোগ রয়েছে।
সংশোধিত আইন ও বিধানে অনুযায়ী কমিশনার নিয়োগের জন্য ৭ সদস্যের একটি সার্চ/বাছাই কমিটি কাজ করে। সংশোধিত বিধানে এই কমিটির সভাপতি থাকবেন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। এ ছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত একজন হাইকোর্ট বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদের স্পিকারের মনোনীত সরকার ও বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ বা সুশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন নাগরিক।
সংশোধিত আইনে কমিশনার হওয়ার যোগ্যতাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আইন, প্রশাসন, বিচার, হিসাব বা নিরীক্ষা, শৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে কাউকে কমিশনার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্য দিকে, বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ, অন্য দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি নেয়া বা অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করাও অযোগ্যতার কারণ হতে পারে। তবে সার্চ কমিটি গঠনের পরই দ্রুত দুদকের চেয়ারম্যান এবং কমিশনার নিয়োগের বিষয়টি সম্পন্ন হতে পারে।
আ. দৈ/কাশেম




















