সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে ডিএনসিসির করুন চিত্র তুলে ধরলেন নতুন প্রশাসক
এজাজ সিন্ডিকের্টের লোপাট,মারাত্নক অর্থ সংকটে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল
আবুল কাশেম:

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের(ডিএসসিসি) বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ওরফে মিল্টন দায়িত্ব গ্রহণের পরই প্রচন্ড আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কারণ ডিএনসিসিকে আর্থিক সংকটের মধ্যে ফেলেছেন সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এবং তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
সাবেক প্রশাসক এজাজের কথিত আত্মীয় দালাল মাহবুব,লিটন, ডিএনসিসির প্রভাশালী আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা,পদস্থ একাধিক প্রকৗশলী,বেশ কয়জন বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং প্রধান ক্রয়- ভান্ডারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লাগামহীন দুর্নীতি ও লোপাটের কারণে ডিএনসিসিতে ব্যাপক অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। এজাজ সিন্ডিকেট গত এক বছরে কয়েক কোটি টাকা লোপাটের পর এখেনো ডিএনসিসিতে ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছেন। ইতোমধ্যে ডিএনসিসিতে দাবি উঠেছে, দ্রুত বিভাগীয় তদন্ত করে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও পদস্থ লোপাটকারীদের বিচারের আওতায় আনার। ধীরে ধীরে তাদের দুর্নীতি ও শত শত কোটি টাকার লোপাটের বিষয়টি চাপা পড়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ওই সিন্ডিকেট নানা কৌশলে বর্তমান প্রশাসককেও দুর্নীতির তকমা দিয়ে বেকায়দায় ফেলবে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা ‘আজকের দৈনিক পত্রিকাকে ’প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে বলেন, আগের প্রশাসক এজাজ দায়িত্ব গ্রহণের পর গত বছর ২৫ জুনে হুট করে বোর্ড সভায় ডিএনসিসি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জন্য ৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করিয়ে নেন। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে তৎকালীন প্রশাসক গতবছর ৬ আগস্ট ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জন্য মাত্র ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেন।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক এজাজ ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের বাজেট ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রায় দ্বিগুন করেছে লোপাটের জন্যই। তাকে বাজেট তৈরি এবং অনুমোধনে সহযোগিতা করেছেন তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মামুন মিয়া এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট আরো বেশ কয়জন কর্মকর্তা। এজাজা বিদায় নেয়ার আগেই বার্ষিক বাজেটের ৯০ শতাংশ অর্থ অনেক অপ্রয়োজনীয় মনগড়া লোক দেখানো ও মুখরোচক বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান ও শত শত কোটি টাকার কেনাকাটাসহ বিভিন্ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন। মোটা অংকের কমিশন ভাগাভাগি করতে গিয়ে ডিএনসিসির কোষাগার শূণ্যে নেমে আসছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভাঙ্গা হয়েছে। আগামী ২ মাস পরে নিয়মিত মাসিক বেতন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের সিন্ডিকেট নেতৃত্বে ছিলেন,অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মোঃ ছাদেকুর রহমান, অঞ্চল-৫এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মো. মিজানুর রহমান বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর এবং প্রশাসকের কথিত আত্মীয় বহিরাগত দালাল লিটন ও মাহবুবুর রহমানসহ ডিএনসিসির সংশ্লিষ্টরা। সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে এটা নজিরহীন ঘটনা। সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের লোপাটকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সূত্র মতে, সাবেক প্রশাসক এজাজের প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে অলিখিত উপদেষ্টা ও চালিকা শক্তির ভূমিকায় ছিলেন অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ছাদেকুর রহমান। তার নিজের অঞ্চলের কাজ ছাড়া অন্য অঞ্চলের কাজের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোন এখতিয়ার নেই। তার পরও নথিথে স্বাক্ষর না করলেও প্রশাসক এজাজের উপদেষ্ঠা হিসেবে অনেক কিছুই তদারকি করতেন।
উল্লেখ্যযোগ্য, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের (পোড়া মার্কেট) দোকান বরাদ্দের নামে কয়েক শত কোটি টাকা লেনদেন, কারওরান বাজারের ব্যবসায়ীদের পুনর বাসনের নামে শত কোটি টাকার লেনদেন, খিলগাঁও তালতলা সপিার মার্কেটের ব্যবসায়ীদের পুনরবাসনের নামে লেনদেন, গুলশান ও বনানী কাঁচা বাজারের দেওয়াল ঘেষে ফুটপাত দখল করে অস্থায়ী পাকা দোকান বরাদ্দের নামে কয়েক কোটি লেনদেন। এছাড়া উত্তরা থেকে শুরু করে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের হকারদের অস্থাীয়ভাবে ভাসমান দোকান বরারদ্দ দেওয়ার অভিযোগ ডিএনসিসির ‘টপ টু বটম’ আলোচিত। তৎকালীন প্রশাসক এজাজ ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতিসহ এসব বিষয় উল্লেখপূর্বক সুনিদিষ্ট অভিযোগ বর্তমানে অনুসন্ধান করছে দুদক।
এজাজকে গত ২৯ জানুয়ারি দুদকে তলব করা হলেও তিনি হাজির হননি। এর ফেব্রুয়ারির শুরুতে দুদকে হাজির হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহম্মদ আসাদুজ্জামান, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী বি.জে. মো. মঈন উদ্দিন। দুদকের অনুসন্ধানের স্বার্থে বাকীদেরও পর্যায়ক্রমে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এদিকে দুর্নীতির দায়ে অঞ্চল-৫এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো.মিজানুর রহমাকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন। এরপরই নিরব রয়েছেন বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। অথচ তার বিরুদ্ধে প্রকৌশল বিভাগের যথাযর্থ পূর্বানুমোদন ছাড়াই সিন্ডিকেটের একক ক্ষমতা বলে তড়িগড়ি করে উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে ৫৯ টি কাজের টেন্ডার আহবানের সুনিদিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আর এসব বিষয়ে তার শেল্টার দাতা অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ছাদেকুর রহমান এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে বর্তমান প্রশাসক নিরব রয়েছেন। তবে ডিএনসিসিকে ঘুষ, লোপাট,বদলি বাণিজ্য ও দুর্নীতির রাহু মুক্ত করতে হলে সাবেক প্রশাসক এজাজের চিহ্নিত সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে আইনী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে।
এসব বিষয় নিয়ে গত ২৪ জানুয়ায়ি আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ছাদেকুর রহমানের সাথে এই প্রতিনিধির কথা হয়। তিনি পরিস্কার ভাষায় বলেছেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়। তিনি তার অঞ্চলের প্রশাসনিক বিষয় দেখেন। অন্যকোন বিষয় নিয়ে হস্তক্ষেপ করেন না। যার ফলে এবার প্রশ্ন উঠেছে, ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক কেনো আলোচিত অভিযোগ, বির্তকিত নথি এবং প্রকল্পের অর্থ লোপাটের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
সচিবালে সাক্ষাতকালে প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন ডিএনসিসির প্রশাসক

ছবিতে-- গত ৩ মার্চ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন ডিএনসিসি নতুন প্রশাসক
এদিকে ডিএসসিসির নতুন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বাধ্য হয়ে গত ৩ মার্চ দুপুরে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের দুর্নীতি ও লোপাটের সংক্ষিপ্ত তথ্য উপস্থাপন করেছেন।
প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান নিরুপায় হয়ে উক্ত প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘করপোরেশন এখন ভঙ্গুর অবস্থায়। ফান্ড নেই অথচ ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকার টেন্ডার দিয়ে ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে দেয়া হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের গত ১০ ফেব্রুয়ারি ছিল তার শেষ কর্মদিবস। ওই দিন অফিস করে ৩৪টি ফাইলের বিল ও নথিতে স্বাক্ষর করে গেছেন। ওইসব ফাইলের বিল দিতে হবে। আসলে ডিএনসিসিতে কোনো টাকাই নেই। ফান্ডে মাত্র ২৫ কোটি টাকা আছে। রাজস্ব বিভাগা থেকে জানাগেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রতি মাসে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের (স্যালারি) পরিশোধ করতে হয় ১৩ কোটি টাকা। এই বেতন দেওয়ার পর ফান্ডে থাকবে আর মাত্র ১২ কোটি টাকা। বিচার-বিশ্লেষণ আপনারাই করবেন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কীভাবে করব?’
ওইদিন ডিএনসিসির প্রশাসক সিটি করপোরেশন চালানোর জন্য নতুন প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর কাছে থোক বরাদ্দ চেয়েছেন। একই সাথে প্রধানমন্ত্রীকে স্থানীয় সরকার (লোকাল গভর্নমেন্ট মিনিস্ট্রিকে) কে বিভিন্ন প্রকল্পকাজে আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সাক্ষাতের পর ঢাকার দুই মেয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ‘গত কয়েক মাসে প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব খাত থেকে কালেকশন আসেনি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর কম হয়েছে। ফরে অর্থ সংকটে পড়েছে ঢাকা দুই সিটি। তারা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন জানান।
আ. দৈ./কাশেম




















