অপমানজন বিদায় এজাজজের, ডিএনসিসির কলঙ্কজনক ইতিহাস
ডিএনসিসির দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসক এজাজকে অপসারণ, নতুন প্রশাসক অতিরিক্ত সচিব- সুরাইয়া
আবুল কাশেম:

অবশেষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বহুল আলোচিত,চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও কয়েক শত কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে দুদকের সন্দেহ ভাজন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজকে অপসারণ করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। একই সাথে সরকার উক্ত মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আক্তার জাহানকে ডিএনসিসির নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন।
আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মাহবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন-১ শাখা থেকে প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর ধারা ২৫ক-এর উপধারা (১) অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সুরাইয়া আক্তার জাহানকে ডিএনসিসির প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হলো।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, নবনিযুক্ত প্রশাসক সুরাইয়া আক্তার জাহান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি তার বর্তমান পদের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করবেন। বিধি অনুযায়ী তিনি কেবল ‘দায়িত্ব ভাতা’ পাবেন; এর বাইরে কোনো আর্থিক বা আনুষঙ্গিক সুবিধা পাবেন না।
এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা ‘আজকের দৈনিক’ প্রত্রিকাকে বলেছেন, রাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরির কেন্দ্রিয় নেতা ও আওয়ামী সরকারের আমলে কারাভোগকারী মোহাম্মদ এজাজ নানাকৌশলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একাধিক উপদেষ্টাদের কাঁধে ভর করে গত বছর ১২ ফেব্রুয়ারি এক বছরের জন্য ডিএনসিসির প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ বাগিয়ে ছিলেন।
প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েই তিনি দাপটের সাথে ডিএনসিসিকে লাভজনক ও একটি মর্যাদাকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি গত এক বছরে এই প্রতিষ্ঠানকে সিন্ডিকেট নির্ভর লোপাটের আখঁড়ায় পরিনত করেছেন। লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানকে ডুবিয়েছেন। তিনি অপমানজন ভাবে বিদায় নিচ্ছেন এজাজজ। যা ডিএনসিসির জন্য এক কলঙ্কজনক ইতিহাস হয়ে থাকবে।
ডিএনসিসির কর্মকর্তারা আরো জানান,আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ২০১১ সালে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন হিসেবে ভাগ করেছে।ওই সময় ৬ মাস মেয়াদে অতিরিক্ত সচিব পদ মর্যাদার কর্মকর্তাদেরকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হতো। টানা ৩ বছর ঢাকার দুই সিটিতেই ৬ জন করে মোট ১২ জন অতিরিক্ত সচিব পদ মর্যাদার কর্মকর্তা মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসক হিসেবে সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটেতে নির্বাচিত মেয়র দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সরকার দুই সিটিতে অতিরিক্ত সচিব পদ মর্যাদায় একজন কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেই ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ও দুর্নীতিবাজ ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম পালিয়ে যান। এর পর সরকার অতিরিক্ত সচিব পদ মর্যাদার সৎ,কর্মঠ ও দক্ষ কর্মকর্তা মো.মাহমুদুল হাসান এনডিসিকে (নিজ দায়িত্বেরঅতিরিক্ত) দায়িত্ব হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরই ডিএনসিসিকে আগের মেয়রে আতিকের সিন্ডিকেট নির্ভর দুর্নীতি ও লোপাাট মুক্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্ঠা করেন। তিনি অনেকটা সফল হয়ে ছিলেন। কিন্তু তাকে হঠাৎ সরিয়ে নিয়ে মোহাম্মদ এজাজকে এক বছরের জন্য প্রশাসক হিসে নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়।
ডিএনসিসির সূত্র মতে, মোহাম্মদ এজাজ এতোটাই কৌশলী, দুর্নীতি গ্রস্ত ও সম্পদ লোভী, আলীবাবার ৪০ চোরের কাহিনীকেও হার মানিয়েছে। তিনি প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পরই পলাতক মেয়র আতিকের সহযোগি ও দুর্নীতির সিন্ডিকেটের কতিপয় কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে নতুন করে জাতীয়তাবাদী শ্লোগানধানী কয়েকজন দুর্নীতি পরায়ন কর্মকর্তা, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা,সচিব, প্রভাবশালী একাধিক প্রকৌশলী,একাধিক বিভাগীয় প্রধান,কতিপয় আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মোহাম্মদ এজাজের নিকটতম আত্মীয় স্বজনদের সমম্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠন করেন।
এজাজের এই সিন্ডিকেট ডিএনসিসিকে দুর্নীতি ও লোপাটের আখঁড়ায় পরিনত করেছেন। ইতোমধ্যে ডিএনসিসির ফান্ড শূন্যেও কোটায় নামিয়েছেন। তিনি নিজে ডুবেছেন একই সাথে ডিএনসিসিকেও ডুবিয়েছেন। যারফলে দুদকের পক্ষ থেকে প্রশাসক এজাজ এবং তার সিন্ডকেটর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, লোপাটের অভিযোগ শক্তভাবে অনুসন্ধান করছে।
একই সাথে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার একটি আদালত গত ১ ফেব্রুয়ারি এজাজের বিরুদ্ধে দেশ ত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এরপর গত ৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব মাহবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ডিএনসিসির প্রশাসকের গত এক বছরে কত টাকা বেতন ভাতাসহ কি কি সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন,তার তথ্য চেয়েছেন। এটা শুধুমাত্র এজাজ কিংবা তার সিন্ডিকেটর জন্য অপমাননাকর নয়, বলতে গেলে তাকে যারা নিয়োগ দিয়েছেন এবং নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছেন তাদের জন্যও অপমানকর।
এতো কিছুর পরও মোহাম্মদ এজাজকে দ্বিতীয় দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ বানোর জন্যতার সিন্ডিকেট বিএনপির হাইকমান্ডের নাম ভাঙ্গিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রভাব খাঁটানোর চেষ্টা করেছেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরেও ডিএনসিসির বিভিন্ন দপ্তরে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটর লোকজন প্রচার করেছেন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ স্যারের মেয়াদ আরো এক বছর বুদ্ধির আদেশ শিগগিরই জারি হচ্ছে।
এদিকে আজ সোমবার দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সদস্যদের ইচ্ছা পুরনের জন্য ৬ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে হয়রানীমূলক ভাবে বদলির আদেশ জারি করেছেন প্রশাসক এজাজের অন্যতম সহযোগি ডিএনসিসির সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব প্রাপ্ত মোম্মদ আসাদুজ্জামান।
বদলির আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, অঞ্চল-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী (অ.দা.) মো. নুরুজ্জামান খানকে অঞ্চল-৪ এ নির্বাহী প্রকৌশলী, অঞ্চল-৮ এর নির্বাহী প্রকৌশলী(অ.দা.) মো. শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়াকে অঞ্চল-৬ এ নির্বাহী প্রকৌশলী, অঞ্চল-৬ এর নির্বাহী প্রকৌশলী (অ.দা.) মো. হারুন-অর রশিদকে অঞ্চল-৮ এ নির্বাহী প্রকৌশলী, অঞ্চল-৪এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমানকে অঞ্চল-১ এ নির্বাহী প্রকৌশলী, অঞ্চল-১০ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইশতিয়াক মাহমুদকে অঞ্চল-৯ এ নির্বাহী প্রকৌশলী এবং অঞ্চল-৯এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুদ্দিন মানিককে অঞ্চল-১০ এ নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বদলি করা হয়েছে।
শুধুতাই বিদায়ের আগে প্রশাসকের সিন্ডিকের চিহ্নিত দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বে নিয়োজিত নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি না করে , উল্টো তাদেরকে শেল্টার দিচ্ছেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিব এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ কর্মকর্তারা।
আ. দৈ./কাশেম




















