আতঙ্কে প্রভাবশালী দুনীীতিবাজ ও লোপাটকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা
ডিএনসিসির প্রশাসক এজাজের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, রয়েছেন নজরদারিতে
আবুল কাশেম:

সরকারের আইন ও বিধি লঙ্ঘন,ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নাানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করে কয়েক শত কোটি টাকা আত্মসাৎ,পদোন্নতি,বদলি ও পোস্টিংয়ের মাধ্যমে মোটা অংকের বাণিজ্যের অভিযোগ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। আতঙ্কে ডিএনসিসির প্রভাবশালী দুনীতিবাজ, লোপাটকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
এছাড়া ডিএনসিসিতে লোক দেখানো ও সস্তায় বাহবা নিতে ছোট বড় বেশ কিছু উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পের নামে ইচ্ছামাফিক শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ এবং বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে বহিরাগত দালাল ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মোটা অংকের কমিশনের অভিযোগ বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ডিএনসিসির প্রশাসক দেশ ছেড়ে বিদেশে পলাতে পারেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে দুদক কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন। যারফরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন বলেছে।
সর্বশেষ খবরে জানা যায়,আজ রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজের আদালত ডিএনসিসির বহুল আলোচিত দুর্নীতির বরপুত্র বলে খ্যাত প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজকে দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। আদালতের এই নিষেধাজ্ঞার জারির পর তার ওপর কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে। শিগগিরই তার পাসপোর্ট জব্দের বিষয়টিও আলোচনা রয়েছে।
এদিকে আজ রোববার বিকেল ৩ টায় দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরো বলেন, এই বিষয়ে পরবর্তীতে কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে,সেটা সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও অনুসন্ধাকারী কর্মকর্তার নির্ধারণ করবেন।
এরআগে আদালত অঙ্গণে দুদকের প্রসিকিউটর দেলোয়ার জাহান রুমি ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দুদকের পক্ষে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. আশিকুর রহমান প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে বিদেশ গমন অর্থাৎ দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন।
আদালতে দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক নানাবিধ অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটির অধীনস্ত মিরপুর গাবতলী পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, বোরাক টাওয়ার বা হোটেল শেরাটন দখলভার, বনানী কাঁচাবাজারে দোকান বরাদ্দ, খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের পার্কিং স্থানে দোকান নির্মাণ ও বরাদ্দ, আগুনে পোড়া মোহাম্মদপুরে কৃষি মার্কেটে দোকান বরাদ্দ ও নির্মাণে , বাসা বাড়ি থেকে ময়লা আর্বজনা টানার জন্য সিটি করপোরেশনের ভ্যান সার্ভিস, ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নানাবিধ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের পক্ষ থেকে গত ২১ জানুয়ারি পাঠানো নোটিশে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২২ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭ এর ৮ বিধিসহ ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬০ ধারা মতে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মোহাম্মদ এজাজকে বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণের জন্য ২৯ জানয়ারি সকাল ১০ টায় হাজির হতে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু দুদকের নোটিশ পেয়েও তিনি দুদক কার্যালয়ে উপস্থিত হননি এবং লোক মাধ্যমে অনিদিষ্টকালের জন্য সময় চেয়ে আবেদন পাঠান। একই সঙ্গে ওই ডিএনসিসিতে নগর ভবনে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে প্রশাসক, সাবেক ও বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা,সচিব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডেকে দীর্ঘ সময় নিয়ে ‘ক্লোজ ডোর’ মিটিং করেছেন। মিটিংয়ের বিষয়বস্তু ছিল দুদকের নোটিশে উল্লেখ করা অভিযোগগুলো নিয়ে।
এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকতা জানান, প্রশাসকের সিন্ডিকেটের লোকজন এখনো দাপটের সাথে বৈআইনী ভাবে সবকিছু করছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের মেয়াদ শেষ হবার আগেই ঠিকাদারদের সব বিল পরিশোধ করার টার্গেট নিয়েছেন।
তারা জানান, প্রশাসক এজাজকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে তার সিন্ডিকেটের সবাইকে ধরা যেতো। ‘গাবতলী গররিহাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প রিকশা চালকদের ট্রাফিক আইন শিখাতে ৩০০ লেপটপ কেনা হয় সাড়ে ৪ কোটি টাকায়। ওই লেপটপের এখন হদিস নেই, এই প্রকল্পের নামে প্রায় ২২ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এছাড়া বনানীতে বোরাক টাওয়ার( হোটেল শেরাটন),বনানী কাঁচাবাজারে দোকান বরাদ্দ, খিলগাঁও তালতলা সুপার মার্কেটের কারপার্কি স্খানে দোকান নির্মাণ, মোহাম্মদপুরে আগুনে পোড়া কৃষি মাকেটের দোকান নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দ দুর্নীতি, আলোচিত ভ্যান সার্ভিস, ফুটপাত দোকান বরাদ্দসহ আরো অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি।
দুর্নীতি,জালিয়াতি, কোটি কোটি টাকার অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়, মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য, আইন অমান্য করে নির্বাহী আদেশে ইচ্ছা মাফিক যাবতীয় কার্যক্রম করা হচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়গুলোও আলোচনায় আসতে পারে।
তিনি প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত বছর ২৫ জুনে বোর্ড সভায় ডিএনসিসি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করিয়ে নেন। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক গতবছর ৬ আগস্ট ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন। কর্পোরেশন। ইতোমধ্যে বার্ষিক বাজেটের ৮০/৯০ শতাংশ অর্থ অনেক অপ্রয়োজনীয় মনগড়া লোক দেখানো ও মুখরোচক বিভিন্ন ধরনের প্রগ্রামে এবং প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন।
সংশ্লিষ্টসূত্র মতে, নগরীর ফুটপাত ও মাকের্টে দোকান বরাদ্দ দেওয়া, কর্মকর্তা- কর্মচারীদের নিয়োগ,বদলি,পদায়ন, বড় বড় কেনা কাটা, উন্নয়ন মূলক প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ থেকে শুরু করে এমন কোন সেক্টর নেই, যেখানে প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ, তার প্রশাসন এবং বহিরাগত আত্মীয়দের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেটের হিংস্র থাবা পড়েনি। দুদক সূত্র মতে, গত ২ নভেম্বর দুদকের চেয়ারম্যানের দপ্তরে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজ জে বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপরারহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণসহ অনেকগুলো সুনিদিষ্ট অভিযোগ দাখিল করা হয়। পরে দাখিল করা আবেদন এবং অভিযোগগুলো যাচাই বাছাই করে এবার অনুসন্ধানর জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী এবং ভান্ডার-ক্রয় কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও সহকারী বর্জ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন, প্রশাসকের আত্মীয় বহিরাগত দালাল লিটন ও মাহবুবুর রহমান, অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মোঃ ছাদেকুর রহমান, অঞ্চল-৫এর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মো. মিজানুর রহমানসহ দুই ডজন ব্যক্তি ও কর্মকর্তা দুদকের নজড়দারিতে রয়েছেন।
প্রয়োজেনের অতিরিক্ত ডিএনসিসিতে কয়েক শত কোটি টাকায় আলমিরা, চেয়ার টেবিল, ফ্যানসহ আসবাবপত্র ক্রয় করা হয়েছে। ভালো ভালো আসবাবপত্র অফিসে রাখার মতো স্থান পর্যন্ত নেই। ভারান্দায়,স্টোরে অযত্নে ফেলে রাখা হয়েছে। ড্রাইভার, ক্লিনারসহ শ্রমিকদের সংগঠনের বিভিন্ন অফিসে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের দপ্তরের সমপরিমান মূল্যের আসবাবপত্রগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়রে রয়েছে। বর্তমানে ডিএনসিসিতে অতিমাত্রায় উন্নয়ন, সংস্কার, লোক দেখানো প্রকল্প এবং অপ্রয়োজনীয় কেনা টাকার বিল পরিশোধ ও কমিশন ভাগাভাগি করতে গিয়ে কোষাগার শূণ্যে নেমে আসছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভাঙ্গার পায়তারা চলছে। এই স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এবং কল্যাণ ফান্ডের টাকা ঠিকাদারদের বেশ কয়টি অগ্রীম বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
আ. দৈ./ কাশেম




















