ঢাকাসহ সারাদেশেই ডেঙ্গু আতঙ্ক বাড়ছে
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তরে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ‘কুইক রেসপন্স টিম’ নেমেছে
আবুল কাশেম

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই এ বছর দীর্ঘ মেয়াদী বৈরি আবহাওয়া থেমে থেমে বৃষ্টি এবং গরম তাপমাত্রায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত রোগী এবং ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বস্থ্য মন্ত্রণালয়,স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ (ডিএনসিসি) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বেশ উদ্বিগ্ন।
কারণ তাদের নানা উদ্যোগ এবং কর্মসূচি সত্বেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রতিদিনই ঢাকাসহ সারাদেশেই ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুও ঘটনায় সরকার ও জনগণ আতঙ্ক বেড়েই চলছে। এ বছর গত জানুয়ারি থেকে ১০ অক্টো পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ২২৪ জনের মুত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা একদিকে যেমন বাড়ছে পাশাপাশি সুস্থতার সংখ্যা বাড়ছে।

আজ শুক্রবার (১০ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরো ৩০৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তবে কোন মৃত্যু নেই। এছাড়া গত জানুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ১৯৩ জনে। এবছর ডেঙ্গুতে ২২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগের ১১৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের ৮৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটিতে ৪৭ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৪০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের ২১ জন রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৩১০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালের ছাড়পত্র পেয়েছে। এবছর ৫০ হাজার ৫১৯ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালের ছাড়পত্র পেয়েছে।
আরো জানানো হয়ম ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়, পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের(ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ভয়ঙ্কর ডেঙ্গুর রোগের জীবানুবাহি ‘এডিস মশা’দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করেছে। পাশাপাশি পুরো ঢাকা মহানগরীতে ডেঙ্গুরোগী ভর্তিকৃত চিহ্নিত ১৭টি হাসপাতালের ডেঙ্গুরোগী বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত অ্যাকশন নিতে ‘কুইক রেসপন্সস টিম’ গঠন করেছে। ডেঙ্গু রোগী ভর্তির ২৪ ঘন্টার মধ্যে ওইসব হাসপাতালের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ১৫ জন ইপিআই সুপার ভাইজারসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় এই ‘কুইক রেসপন্স টিম’ মাঠে নেমেছে।

এ ব্যাপারে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী ‘আজকের দৈনিক পত্রিকাকে’ বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষ অভিযান পরিচালত হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি সরেজমিন ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংগ্রহ, রোগীদের বিশেষত বসবাসের ঠিকানা সংগ্রহের কর্মসূচি গত ৭ অক্টোবর থেকে বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই কর্মসূচি আগামী ৩১ নভেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে।ইতোমধ্যে তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা চেয়ে তালিকাভুক্ত ১৭টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরো বলেন, সর্বোচ্চ ডেঙ্গুরোগী ভর্তিকৃত ১৭টি হাসপাতালের ডেঙ্গুরোগী তথ্য সংগ্রহের জন্য ইপিআই সুপার ভাইজারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সঠিক তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং ডেঙ্গ রোগ প্রতিরোধে মশক নিধনসহ সার্বিক কার্যক্রমে সহায়তা করবেন।
তালিকাভুক্ত ১৭টি হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহকারীদের নাম এবং মোবাইল নম্বরসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ করবেন- রাহেল মিয়া, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের- রতন মিয়া, ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের- মো. কামরান, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের- মো. সোহাগ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের-সেলিম, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের- মো. সাদ্দাম হোসেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের-তানিয়া, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের-স্বর্ণা আক্তার, শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের-মো. সাদ্দাম হোসেন, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের-মো. ওবায়দুল্লাহ, ডঃ এম আর খান শিশু হসপিটাল এন্ড ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হাসপাতালের- শায়লা আক্তার, হেলথ ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের- নাহিদ আক্তার, এ এম জেড হাসপাতালের-কামরুন্নাহার, শিন-শিন জাপান হাসপাতালের- আফরোজা বেগম, উত্তরা আল-আশরাফ জেনারেল হাসপাতালের- শারমিন আক্তার, উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালের- আনোয়ারুল হক জনি, উত্তরা জেনারেল হাসপাতালের-আনোয়ারুল হক জনি। তাদেরকে সরাসরি তালিকাভুক্ত হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হওয়া প্রতিটি ডেঙ্গু রোগীর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। ডিএনসিসি থেকে সরবরাহ করা নির্ধারিত ফরমের ছক অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পূরণ কতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তালিকা ভিত্তিক ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংগ্রহ ফরর্ম পূরণের উদ্দেশ্য হলো:

তাৎক্ষনিক ভেক্টর কন্ট্রোলকশন করা। ডিএনসিসি এলাকায় বসবাসকারী এবং হাসপাতালসমূহের ভর্তিকৃত ডেঙ্গু রোগীদের সঠিক ঠিকানা ও গুরুত্বপূর্ণ এপিডেমিওলজিক তথ্য সংগ্রহ এবং তদনুযায়ী মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা, সম্মতি প্রদানের বিষয়টি রোগী/অভিভাবককে পড়ে শোনাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসির ডেঙ্গু রোগ এবং এর বাহক এডিস মশার নজরদারির জন্য এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই তথ্য কেবলমাত্র জনস্বাস্থ্য ব্যবহারের (যেমন: আপনার বাড়ির আশেপাশে মশা নিয়ন্ত্রণ) জন্য ব্যবহার হবে এবং নিরাপদে সংরক্ষিত থাকবে। তথ্য নথিভুক্ত করা ও প্রয়োজনে যোগাযোগ করার জন্য বলা হচ্ছে।
সরবরাহ করা ফরমে উল্লেখ রয়েছে, রোগী ও অভিভাবকগণ তথ্য দিতে সম্মতি দেওয়া হয়েছে: হ্যাঁ, না । তাদের বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা লিখতে বলা হয়েছে, । যেমন গ্রাম. সড়ক/গলি: মহল্লা/ওয়ার্ড/ইউনিয়ন/ উপজেলা ও জেলা।
আর ডিএনসিসির আওতাভুক্ত ঠিকানা নিশ্চিত করণ, বসতবাড়ির ঠিকানা, রোগী/অভিভাবকের বক্তব্য, বাড়ি/হোল্ডিং/ফ্ল্যাট নং: সড়ক/গলি: মহল্লা/ওয়ার্ড/ইউনিয়ন: অঞ্চল. ও জেলা । যোগাযোগের মোবাইল (রোগী/অভিভাবক): হাসপাতালের নথিতে অন্তর্ভুক্ত ঠিকানা: হাসপাতালের নথিতে অন্তর্ভুক্ত এবং রোগীর প্রদত্ত ঠিকানাও সংগ্রহ করা ফরমে উলিখতে বলা হয়েছে।
আরো নির্দেশনায় রয়েছে, আংশিকভাবে ভিন্ন ৫. এক্সপোজার ও এর বিবরণ , পূর্বে ডেঙ্গু হয়েছে? না /হ্যাঁ, সাল:, দিনের বেশি সময় কোথায় অতিবাহিত হয়? বাড়ি কর্মস্থল/শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস/ কর্মক্ষেত্র, অস্থায়ীভাবে অবস্থান/হোস্টেল এর ঠিকানা: বিগত ১৪ দিনের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বাইরে ভ্রমণ? না হ্যাঁ, জেলা/এলাকা: তারিখ: থেকে, বিগত ১৪ দিনে ডিএনসিসির বাইরে থেকে কোন অতিথি জ্বর/ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আপনার বাসায় অবস্থান করেছে। কিনা? না/ হ্যাঁ।
পরিবেশগত ঝুঁকি (বিগত ১৪ দিন) বাড়িতে পানি সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয়? হ্যাঁ না, বাড়ির ২০০ মিটারের মধ্যে নির্মাণ কাজ চলছে? হ্যাঁ /না, দুই বাড়ির মাঝখানে এবং পিছনে আবর্জনার অবস্থা: প্রচুর মোটামুটি,নাই , ছাদবাগান/টবে পানি জমে? হ্যাঁ /না, বাড়ির ভেতর/চারপাশে মশার প্রজনন দেখেছেন? হ্যাঁ না, জানি না, বাড়ির বেজমেন্টে জমা পানি/মশার প্রজননস্থলে (পরিত্যক্ত পাত্র, পলিথিন প্লাস্টিকের বর্জ্য) ইত্যাদি রয়েছে? গত ৪ সপ্তাহে পরিবার/পাড়া-প্রতিবেশীর ডেঙ্গু হয়েছে? না হ্যাঁ (সংখ্যা): জরিপ কার্যে সহায়তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ব্যবহারের জন্য (ভেক্টর কন্ট্রোল টিকেট)।
এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা এই প্রতিনিধিকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ডেঙ্গু রোগের জীবানুবাহি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধুমাত্র রুটিন ওয়ার্ক করে যাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে মশক নিধন কর্মী (স্প্রে ম্যান, ক্রু),মশক সুপারভাইজার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এক জায়গায় জড়ো করে ব্যানার সামনে রেখে মশা মারা এবং পরিচ্ছন্নতা কাজের মহড়া দেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মশক নিধনে কার্যক্রম অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। নাগরিক সেবায় ‘রুটিন ডিউটির বাইরে’ অতিরিক্ত কোন কাজ তারা করতে চান না। অথচ উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ‘টপ টু বটম’ অনেক কর্মকর্তাই অতিরিক্ত সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করেন বলেও নানা কথা নোনা যায়। সরেজমিন তদন্ত হলে অনেক দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে।
আ. দৈ./কাশেম




















