"BASIS-BACCO সংগঠন নির্বাচন: নেতৃত্ব বদলায়, সাধারণ আইটি পেশাজীবীদের ভাগ্য বদলায় না কেন?"
মো. তৌফিক রহমান

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উন্নয়ন কি কেবল সংগঠনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এবার গুরুত্ব পাবে সাধারণ প্রযুক্তিকর্মীদের অধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পের প্রকৃত অগ্রগতি?
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল উদ্ভাবনের ভূমিকা অপরিহার্য। বিশ্ব প্রতিনিয়ত প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ, মেধাবী প্রকৌশলী এবং দক্ষ প্রযুক্তিকর্মী। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প এখনো একটি সুসংগঠিত নীতিমালা, কার্যকর কর্মপরিকল্পনা এবং টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে ভুগছে।
বাংলাদেশে BASIS, BACCO, BCS-সহ একাধিক তথ্যপ্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনের মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা, প্রযুক্তিকর্মীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা। কিন্তু বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। শিল্পের সাধারণ কর্মজীবী মানুষের সমস্যা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে এসব সংগঠনের দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক উদ্যোগ কতটুকু—সেই প্রশ্ন আজ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
নির্বাচন আছে, কিন্তু সাধারণ প্রযুক্তিকর্মীদের জন্য কী আছে?
প্রতিবার নির্বাচন এলেই বিভিন্ন সংগঠনে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। প্রার্থীরা সক্রিয় হন, নানা প্রতিশ্রুতি দেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং শিল্পের উন্নয়নে পরিবর্তনের আশ্বাস দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর কতটুকু বাস্তবায়িত হয়?
নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়, নতুন মুখ দায়িত্ব গ্রহণ করেন, আবার নির্দিষ্ট সময় পর নতুন নির্বাচন আসে। কিন্তু সাধারণ প্রযুক্তিকর্মীদের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কতটুকু আসে? শিল্পের মৌলিক সমস্যাগুলো কি সমাধান হয়? দক্ষতা উন্নয়ন, ন্যায্য কর্মপরিবেশ, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা কিংবা পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর কোনো পরিবর্তন কি দৃশ্যমান?
আইটি পেশাজীবীদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর সংগঠন কোথায়?
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে হাজার হাজার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, প্রোগ্রামার, বিজনেস অ্যানালিস্ট, প্রজেক্ট ম্যানেজার, সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার, আইটি সাপোর্ট পেশাজীবী এবং অন্যান্য প্রযুক্তিকর্মী কাজ করছেন। অথচ তাঁদের পেশাগত অধিকার ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা এখনো অত্যন্ত দুর্বল।
এই খাতের অনেক কর্মজীবী মানুষ নানাভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রজেক্টভিত্তিক নিয়োগের নামে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কখনো প্রকল্প শেষ হওয়ার অজুহাতে, কখনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের কারণে কর্মীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া বেতন কাঠামোর অসংগতি, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সীমিত সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে যথাযথ মূল্যায়নের অভাব এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট পথ না থাকার মতো সমস্যাও রয়েছে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব সমস্যা নিয়ে সাধারণ প্রযুক্তিকর্মীরা কোথায় যাবেন? তাঁদের অভিযোগ শোনার মতো কোনো কার্যকর প্রতিনিধিত্বমূলক প্ল্যাটফর্ম কোথায়?
মেধাবীদের দেশত্যাগ: আমরা কি আমাদের মানবসম্পদ ধরে রাখতে পারছি?
বাংলাদেশের বহু মেধাবী প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিকর্মী উন্নত কর্মপরিবেশ, গবেষণার সুযোগ, পেশাগত স্বীকৃতি এবং উন্নত জীবনমানের প্রত্যাশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তাঁদের অনেকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা ও উদ্ভাবনমূলক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
এটি নিঃসন্দেহে তাঁদের ব্যক্তিগত অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আমরা যদি আমাদের মেধাবীদের যথাযথ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ, পেশাগত নিরাপত্তা এবং সম্মানজনক ক্যারিয়ার নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে দেশের প্রযুক্তি শিল্প দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদের সংকটে পড়বে।
এবার প্রয়োজন নেতৃত্বের নয়, ব্যবস্থার পরিবর্তন
আবারও BASIS ও BACCO-সহ বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচন সামনে আসছে। প্রার্থীরা ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন, নানা প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করছেন। আমরা তাঁদের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানাই। তবে সাধারণ প্রযুক্তিকর্মীদের প্রত্যাশা শুধু নির্বাচনী বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
এক্ষেত্রে সরকারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে দলীয় পরিচয়, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা গোষ্ঠীগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য, দক্ষ, দূরদর্শী এবং শিল্পের প্রকৃত সমস্যা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা শুধু নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখবেন না; বরং পুরো শিল্পের উন্নয়ন, সাধারণ প্রকৌশলীদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়েও ভাববেন।
আমাদের প্রত্যাশা: সাধারণ প্রকৌশলীদের জন্য একটি কার্যকর প্রতিনিধিত্ব
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকে এগিয়ে নিতে কয়েকটি বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:
১. আইটি পেশাজীবীদের অধিকার ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা: চাকরির শর্ত, নোটিশ পিরিয়ড, ন্যায্য বেতন এবং কর্মক্ষেত্রের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর শিল্পভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন।
২. কর্মজীবীদের প্রতিনিধিত্ব: সাধারণ প্রযুক্তিকর্মীদের মতামত, অভিযোগ ও অধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য কার্যকর প্রতিনিধিত্বমূলক প্ল্যাটফর্ম গঠন।
৩. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: সংগঠনগুলোর আয়-ব্যয়, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, বার্ষিক কার্যক্রম এবং অর্জন সম্পর্কে সদস্য ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ।
৪. দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পের সম্প্রসারণ: সফটওয়্যার ও আইটি সেবার আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, স্টার্টআপ সহায়তা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।
৫. মেধা পাচার রোধ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: মেধাবী প্রকৌশলীদের দেশে কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ, প্রতিযোগিতামূলক বেতন এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা।
শেষ কথা
আমরা নির্বাচনবিরোধী নই। নেতৃত্বের পরিবর্তনও প্রয়োজন। কিন্তু পরিবর্তন শুধু চেয়ার বা পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সেই পরিবর্তনের কোনো অর্থ থাকে না।
আমরা চাই, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সংগঠনগুলো শুধু নির্বাচনী আয়োজন, সভা-সেমিনার কিংবা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পের প্রকৃত সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখুক।
লেখক: প্রকৌশলী মো. তৌফিক রহমান
আ.দৈ/আরএস




















