সবুজের বুকে সাহসের মহড়া
নিজস্ব প্রতিবেদক

নগরের বুকে যেখানে আকাশ ঢেকে যায় বহুতল ভবনের ধূসর ক্যানভাসে, যেখানে শৈশব বন্দি হয়ে পড়েছে চার দেয়ালের কৃত্রিম আলো আর যান্ত্রিক স্ক্রিনের মায়াজালে—সেখানে ঢাকাবাসীর ক্লান্তি হরণের একমাত্র পরম আশ্রয়স্থল রমনা পার্ক। ঋতু পরিবর্তনের আবর্তে রমনা একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে। কখনো ঘন সবুজ, কখনোবা ঝরা পাতার উদাসীনতা।
কিন্তু এই সমস্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমান্তরালে, প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার আর শনিবারের সকালটা এখানে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্পের অবতারণা করে। এই দুটো দিন মানেই ভোরের স্নিগ্ধ শান্ত প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে একদল অদম্য, প্রাণোচ্ছ্বল শিশু-কিশোরের নতুন করে জেগে ওঠা।
ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি দৃশ্যটি কেবল একটি মুহূর্তের স্থিরচিত্র নয়, এটি যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। ছবির দিকে তাকালে প্রথমেই চোখ আটকে যায় প্রকৃতির সেই প্রাচীন আদিমতার দিকে। বিশাল দুটি মহীরুহ, যাদের জটাবাঁধা শিকড় আর ছড়ানো ডালপালা যেন যুগ যুগ ধরে এই মাটিকে আগলে রেখেছে।
বসন্ত কিংবা গ্রীষ্মের বিদায়বেলায় ওপর থেকে ঝরে পড়া সোনালী-হলুদ ফুলের পাপড়িগুলো নিচের মাটিতে এক অদ্ভুত আল্পনা তৈরি করেছে। ঘাসের সবুজ আর ঝরে পড়া ফুলের এই প্রাকৃতিক কার্পেটকে ম্যাট বানিয়ে, সেই প্রাচীন বৃক্ষছায়াতলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে একঝাঁক খুদে যোদ্ধা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কোনো নিপুণ চিত্রশিল্পী সবুজের ক্যানভাসে ধবধবে সাদা কাদার ফোঁটা দিয়ে এক সুশৃঙ্খল অবয়ব তৈরি করেছেন।
ওরা সবাই স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী। কেউ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হচ্ছে, কেউবা পা রেখেছে কৈশোরে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে যখন পড়ালেখার তীব্র চাপ আর শহরের একঘেয়েমি ওদের ক্লান্ত করে তোলে, তখন এই দুটো দিন ওরা খুঁজে নেয় মুক্তির অনন্য স্বাদ। রমনা পার্কের ঐতিহ্যবাহী ‘রানীর মাঠ’-এর ঠিক পশ্চিম পাশের এই নির্জন চত্বরটিই তখন রূপান্তরিত হয় এক অনন্য রণক্ষেত্রে। ধবধবে সাদা ‘গি’ (কারাতের পোশাক) পরিহিত এই ছেলেমেয়েরা যখন কোমরে রঙিন বেল্ট বেঁধে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন ওদের চোখ-মুখে খেলা করে এক দৃঢ় প্রত্যয়।
এই উন্মুক্ত আঙিনায় ওরা কেবল হাত-পায়ের ক্ষিপ্রতা কিংবা আত্মরক্ষার কৌশলই শিখছে না, বরং শিখছে জীবনের সবচেয়ে বড় পাঠ—শৃঙ্খলা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ। ছবির বাঁ দিকে প্রশিক্ষকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর ডান দিকে দলবদ্ধ শিক্ষার্থীদের নিবিড় মনোযোগ প্রমাণ করে, এখানে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ডালপালার ফাঁক গলে আসা ভোরের নরম আলো যখন ওদের ঘর্মাক্ত কপালে এসে পড়ে, তখন সেই ঘামবিন্দুগুলো মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে। প্রশিক্ষকের প্রতিটি কাউন্টের সাথে সাথে যখন ওদের সমবেত কণ্ঠের গর্জন বা ‘কিআই’ বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন রমনার শান্ত পরিবেশেও এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। সেই বজ্রকঠিন আওয়াজ যেন এই নগরীকে মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কাপুরুষ হতে শেখেনি।
পরম শূন্য থেকে শুরু করে আজ এই মাঠ থেকেই অনেকে নিজেদের কঠোর পরিশ্রমে আর নিষ্ঠায় অর্জন করে নিয়েছে কারাতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ব্ল্যাক বেল্ট’। কোমরের সেই কালো কিংবা রঙিন সুতোগুলো শুধু দক্ষতার স্মারক নয়, বরং তা এই শিশুদের অজস্র সকালের ঘুম বিসর্জন দেওয়া, বারবার আছাড় খেয়েও আবার উঠে দাঁড়ানো এবং প্রতিটি পেশির ব্যথার ওপর জয়ী হওয়ার এক নীরব ইতিহাস। ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের এই সমমানের অংশগ্রহণ সমাজের এক পজিটিভ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়; ওরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি নিজেদের করে তুলছে স্বাবলম্বী।
আজকের দিনে যখন আমাদের সমাজ ক্রমশ যান্ত্রিক এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন প্রকৃতির এত কাছাকাছি এসে, মাটির গন্ধ শুঁকে এই কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা অর্জনের এই মহড়া সত্যিই এক পশলা তাজা বাতাসের মতো। বেলা বাড়ার সাথে সাথে হয়তো এই পাঠশালার দৈনিক অনুশীলন শেষ হয়ে যায়, ধুলোবালি মেখে ওরা আবার ফিরে যায় যার যার চেনা গণ্ডিতে।
কিন্তু সবুজের মাঝে অর্জিত এই আত্মবিশ্বাস, এই সাহস ওরা বয়ে নিয়ে যায় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। রমনার রানীর মাঠের এই সকালগুলো তাই কেবলই কোনো সাধারণ শরীরচর্চার দৃশ্য নয়; এটি প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে একটি সুস্থ, সবল, নীতিবান এবং অপরাজেয় প্রজন্ম গড়ে তোলার এক নীরব, কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী বিপ্লব।
আ.দৈ/আরএস/এএইচএইচ




















