মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কাজ বেশি হচ্ছে, নাকি শুধু ব্যস্ততা বাড়ছে?
মোঃ মুবির মাহমুদ চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২৫ পিএম   (ভিজিট : ০)
X

একটি প্রতিষ্ঠানের খরচের হিসাব করতে গেলে সাধারণত বেশ কিছু বিষয় খুব সহজেই চলে আসে। সেই প্রতিষ্ঠানে কতজন কর্মী আছেন, তাদের বেতন কত, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার পেছনে কত খরচ হচ্ছে, প্রয়োজনে ওভারটাইমে কত টাকা দিতে হচ্ছে, এসবের হিসাব আমাদের কাছে থাকে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে, যার উত্তর হয়তো অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছেই এতটা পরিষ্কার নয়ঃ কর্মীদের যে সময়ের জন্য আমরা অর্থ দিচ্ছি, সেই সময়ের কতটা আসলে প্রতিষ্ঠানের জন্য সত্যিকারের কোনো মূল্য তৈরি করছে?

‘সময় নষ্ট হওয়া’ বলতে আমরা সাধারণত এমন একটি পরিস্থিতি বুঝি যেখানে কেউ কাজ না করে বসে আছে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একজন কর্মী কোনো তথ্যের জন্য অপেক্ষা করছেন, একজন বিক্রয়কর্মী এমন একটি রুটে যাচ্ছেন যেটি ভালোভাবে পরিকল্পনা করলে কম সময়ে শেষ করা যেত, একজন কর্মী এমন একটি তথ্য আবার লিখছেন যা অন্য একটি বিভাগে এরই মধ্যে দেওয়া হয়েছে, কিংবা একজন ব্যবস্থাপক বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছেন, সব ক্ষেত্রেই মানুষ কাজ করছে। কিন্তু সেই কাজের পুরো সময়টি প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান মূল্য তৈরি করছে কি না, সেটি ভেবে দেখা দরকার।

আমরা সাধারণত প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ কাজ হচ্ছে, সেটি মাপতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কতটি মিটিং হয়েছে, কতটি রিপোর্ট তৈরি হয়েছে, কতজন গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, কতটি দোকান পরিদর্শন হয়েছে, কর্মীরা কত ঘণ্টা কাজ করেছেন, এসবের হিসাব রাখা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু এই কাজগুলো করতে গিয়ে কতটা সময় সত্যিই প্রয়োজনীয় ছিল এবং কতটা সময় প্রতিষ্ঠানের কাজের পদ্ধতির কারণেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, সেই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম করা হয়।

ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের দুজন কর্মী প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করেন। তাদের কর্মঘণ্টা একই, বেতনও হয়তো প্রায় একই। কিন্তু একজনের দিনের বেশিরভাগ সময় সরাসরি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাজের পেছনে যাচ্ছে, আর অন্যজনের দিনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে তথ্য খোঁজা, অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করা, অন্য বিভাগের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা, আগের কোনো ভুল সংশোধন করা কিংবা একই তথ্য একাধিক জায়গায় দেওয়ার কাজে। দুজনই হয়তো খুব ব্যস্ত, দুজনই হয়তো দিনের শেষে বলতে পারবেন যে তারা সারাদিন কাজ করেছেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি হওয়া ফলাফল কি দুজনের ক্ষেত্রে একই হবে?

খুব জোর দিয়েই বলতে পারি যে উপরের দুইজনের ফলাফল এক হবে না। তাই প্রশ্নটা কর্মী কতটা পরিশ্রম করছেন, সেটি নিয়ে নয়। বরং প্রশ্নটা হলো, কাজের পদ্ধতিটি কি কর্মীর সময়কে তার সবচেয়ে মূল্যবান কাজে ব্যবহার করার সুযোগ দিচ্ছে?

আমার কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একটি প্রতিষ্ঠানের অনেক অদক্ষতা আসলে কোনো একটি বড় ভুলের কারণে তৈরি হয় না। বরং ছোট ছোট কিছু বিষয় নিয়মিতভাবে ঘটে এবং সময়ের সঙ্গে সেগুলো স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। একজন কর্মী প্রতিদিন কয়েক মিনিট তথ্য খুঁজতে ব্যয় করছেন, আরেকজন প্রতিদিন কিছু সময় অপেক্ষা করছেন, কোনো একটি কাজ শেষ করতে একাধিক অনুমোদনের প্রয়োজন হচ্ছে, আবার কোথাও একই তথ্য একাধিকবার তৈরি বা যাচাই করতে হচ্ছে। আলাদাভাবে দেখলে এগুলোর কোনোটিই হয়তো খুব বড় সমস্যা নয়। কিন্তু একই কাজ যদি প্রতিদিন এবং বহু মানুষের মাধ্যমে করতে হয়, তাহলে সেই ছোট ছোট সময়গুলো একসময় প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণ হতে পারে।

সমস্যার আরেকটি দিক হলো, এই ক্ষতিটা সাধারণত আলাদা কোনো খাতে দেখা যায় না। আমরা জানি একজন কর্মীর বেতন কত, কিন্তু জানি না তার কর্মঘণ্টার কতটা এমন কাজে চলে যাচ্ছে যার থেকে আদৌ কোনো ফলাফল আসছে না বা প্রতিষ্ঠান সেই সময়টুকু থেকে সেই কর্মীর পিছনে করা খরচের বিপরীতে কোনো মূল্য পাচ্ছে না। আমরা জানি একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কতজন মানুষ যুক্ত আছেন, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ার কোন ধাপে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে, সেটি হয়তো জানি না। ফলে সমস্যা তৈরি হলেও আমরা অনেক সময় তার মূল কারণের বদলে দৃশ্যমান ফলাফলটি নিয়েই কাজ করতে শুরু করি।

বাংলাদেশের উৎপাদন খাত নিয়ে ২০২১ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। গবেষণায় উঠে আসে যে জরিপ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৩২ শতাংশেই কোনো কবু চবৎভড়ৎসধহপব ওহফরপধঃড়ৎ বা কচও পর্যবেক্ষণ করা হয় না। একই গবেষণায় উন্নত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ভালো কর্মদক্ষতার সম্পর্কও পাওয়া যায়। আমার কাছে এই তথ্যের গুরুত্ব শুধু ৩২ শতাংশ সংখ্যাটিতে নয়; বরং এর মাধ্যমে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, সেটি হলো যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যই যদি আমাদের কাছে না থাকে, তাহলে আমরা বুঝব কীভাবে কোথায় উন্নতি করা দরকার?
তাহলে সমাধান কোথায়?

প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধির যাত্রার শুরুটা সবসময় নতুন কোনো সফটওয়্যার কেনা দিয়ে হওয়া উচিত নয়। বরং প্রথমে বুঝতে হবে, প্রতিষ্ঠানের কোন কাজগুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই কাজগুলো সম্পন্ন করতে গিয়ে কোথায় অপ্রয়োজনীয় সময় ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে। কোথাও যদি এমন কোনো ধাপ থাকে যার প্রয়োজন নেই, সেটি বাদ দিতে হবে। কোনো প্রক্রিয়া যদি অযথা জটিল হয়, সেটি সহজ করতে হবে। আর এরপরও যদি কোনো কাজ বারবার করতে হয় এবং সেখানে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সময় ও ভুল দুটোই কমানো সম্ভব হয়, তখন সেটিকে প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও কার্যকর করা যেতে পারে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অদক্ষ প্রক্রিয়াকে শুধু ডিজিটাল করলেই সেটি দক্ষ হয়ে যায় না। বরং অনেক সময় আমরা পুরোনো পদ্ধতিটাকেই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে চালাতে শুরু করি। তখন প্রযুক্তি সমস্যার সমাধান না করে সমস্যাটিকে আরও দ্রুত করার ব্যবস্থা করে দেয়। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে কাজের পদ্ধতিটিকে বোঝা এবং প্রয়োজন হলে পরিবর্তন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটাও একটু পরিবর্তন করা দরকার। কর্মীরা কত ঘণ্টা কাজ করছেন, কতগুলো কাজ করছেন বা কতগুলো রিপোর্ট তৈরি করছেন, এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের দেখতে হবে, সেই কাজের পেছনে কতটা সময় সত্যিই মূল্য তৈরি করছে এবং কতটা সময় এমন কাজে চলে যাচ্ছে যা অন্যভাবে করা যেত বা হয়তো করাই প্রয়োজন ছিল না।

আমরা সাধারণত হিসাব করি, একজন কর্মীর পিছনে প্রতিষ্ঠানের কত টাকা খরচ হচ্ছে। তার বেতন, ভাতা, অফিসের জায়গা, সরঞ্জাম, সবকিছুর হিসাব করা হয়। কিন্তু এর পাশাপাশি হয়তো আরেকটি হিসাব করার সময় এসেছে: প্রতিষ্ঠানের কাজের পদ্ধতির কারণে একজন কর্মীর কতটা উৎপাদনশীল সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয় হচ্ছে?

কারণ একটি প্রতিষ্ঠান তখনই শুধু সময় হারায় না, যখন তার কর্মীরা কাজ করা বন্ধ করে দেন। অনেক সময় মানুষ নিয়মিত কাজ করতে থাকে, সবাই আপাতদৃষ্টিতে ব্যস্ত থাকে, রিপোর্ট তৈরি হয়, মিটিং হয়, কর্মীরা ছুটে বেড়ান, তারপরও সেই ব্যস্ততার একটি অংশ হয়তো এমন কাজের পেছনে যায়, যা প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো অতিরিক্ত মূল্য তৈরি করে না।তাই উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরবর্তী সুযোগ কর্মীদের আরও বেশি কাজ করানোর মধ্যে নয়; বরং তাদের যে সময় ও সক্ষমতা ইতিমধ্যে আছে, তার কতটা সত্যিকার অর্থে কাজে লাগছে, সেটি বোঝার মধ্যে।

লেখক: একজন উদ্যোক্তা, ব্যবস্থাপনা পরামর্শক, কর্পোরেট প্রশিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক


আ.দৈ/এসআর







Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝