বর্ষা পেরিয়েও কমছে না ডেঙ্গু সংক্রমণ, বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি;
মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন
শাহীন রহমান

বর্ষা বিদায় নেওয়ার সময় হলেও বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার লক্ষণ নেই। বরং চলতি বছরের অক্টোবরেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা আগের মাসকে ছাড়িয়ে গেছে। মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বরকে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এ বছর পরিস্থিতি নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে অক্টোবরের পরিসংখ্যান। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, ডেঙ্গুর ঝুঁকি এখন আর কেবল বর্ষাকেন্দ্রিক নয়; আবহাওয়া, নগর ব্যবস্থাপনা, মশা নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি মিলিয়ে দীর্ঘ হচ্ছে সংক্রমণের মৌসুম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত মাসভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। অক্টোবরের প্রথম ২৫ দিনেই এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ২২৮ জনে। অর্থাৎ মাস শেষ হওয়ার আগেই অক্টোবর আক্রান্তের সংখ্যায় সেপ্টেম্বরকে ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়, আর অক্টোবরে ২৫ দিন পর্যন্ত মারা যান ১৩৯ জন। পরিসংখ্যান বলছে, আক্রান্তের হিসাবে অক্টোবর এগিয়ে থাকলেও মৃত্যুর হিসাবে সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি ছিল বেশি ভয়াবহ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ডাবের খোসা ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এ মশা জন্মায়। নিয়মিত এসব স্থান পরিষ্কার না করলে অল্প সময়েই মশার সংখ্যা বাড়তে পারে। ফলে বৃষ্টি কমে গেলেও আগে জমে থাকা পানি এবং অনিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশের বড় শহরগুলোতে ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণকাজ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এক এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ করা হলেও আশপাশের এলাকায় প্রজননস্থল থেকে গেলে সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ কারণে শুধু ওষুধ ছিটানো বা সাময়িক অভিযান দিয়ে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, প্রজননস্থল শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম।
তাদের মতে দেশে অতীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত বর্ষাকালে বাড়তে দেখা গেছে। সস্প্রতি সময়ে বছরভেদে সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময় পরিবর্তিত হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ধরন, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই আগস্ট বা সেপ্টেম্বরকে ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ পিক ধরে নিয়ে অক্টোবরের পর ঝুঁকি কমে গেছে—এমন ধারণা বিপজ্জনক হতে পারে।
তারা বলছেন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবার অবস্থা গুরুতর হয় না। কিন্তু জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও কিছু রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি। নিজে থেকে ওষুধ গ্রহণ, বিশেষ করে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন ওষুধ ব্যবহার, বিপজ্জনক হতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং নাগরিকদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। নিয়মিত মশার লার্ভা শনাক্ত ও ধ্বংস, নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন, বর্জ্য অপসারণ, কার্যকর নজরদারি এবং এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগী ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মৌসুমি তৎপরতার বদলে সারা বছর কার্যকর ব্যবস্থা চালু রাখা। অক্টোবরের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, বর্ষা শেষ হলেই বিপদ শেষ হয়ে যায় না। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে হলে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসম্পৃক্ততা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগকে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে। অন্যথায় ডেঙ্গুর মৌসুম আরও দীর্ঘ হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
আ.দৈ/এসআর




















