অক্টোবরেই ডেঙ্গু কেন উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে
শাহীন রহমান

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার লক্ষণ নেই। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এক দিনে আরও ৯ জনের মৃত্যু এবং প্রায় দুই হাজার রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬ জনে। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে এক লাখ। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে এসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির পর মশার বংশবৃদ্ধি এবং সংক্রমণ বৃদ্ধির মধ্যে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধান থাকতে পারে। ফলে বৃষ্টি কমে গেলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় না। অক্টোবরেও রোগীর সংখ্যা বেশি থাকার পেছনে আগের সপ্তাহগুলোর আবহাওয়া ও মশার প্রজননের প্রভাব থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ নিশ্চিত করতে আরও বিস্তারিত রোগতাত্ত্বিক তথ্য প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৫৪ জন। এ সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৯৬৫ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ৯৭ হাজার ২৯৬ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। অন্যদিকে, সর্বশেষ প্রতিবেদনে ৫ হাজার ৭৮৪ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
এক দিনে প্রায় দুই হাজার রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা ডেঙ্গুর বিস্তারের ব্যাপকতা তুলে ধরে। যদিও একই সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, তবু নতুন রোগী ভর্তি এবং মৃত্যুর ধারাবাহিকতা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া এবং হাসপাতালের শয্যা ও চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সেপ্টেম্বরের পরও কমছে না মৃত্যুর সংখ্যা
চলতি বছরের মাসভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকটি আরও স্পষ্ট করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরে কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ। এর আগে আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অক্টোবরেও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সেপ্টেম্বরে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর অক্টোবরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এক দিনের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরো মাসের প্রবণতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে নতুন রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা বলছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সতর্কতা কমানোর সুযোগ নেই।
ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগে মৃত্যু
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ জনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় তিনজন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় দুজন রয়েছেন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে দুজন, চট্টগ্রাম বিভাগে একজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা শুধু রাজধানীর একটি অংশে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলেও অন্যান্য বিভাগেও প্রাণহানি ঘটছে। ফলে নগর এলাকার পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগী শনাক্ত এবং চিকিৎসার প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।
বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি
ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে এডিস মশার প্রজনন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পরিবর্তন মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বৃষ্টির পানি ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়তে পারে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃষ্টির পর মশার বংশবৃদ্ধি এবং সংক্রমণ বৃদ্ধির মধ্যে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধান থাকতে পারে। ফলে বৃষ্টি কমে গেলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় না। অক্টোবরেও রোগীর সংখ্যা বেশি থাকার পেছনে আগের সপ্তাহগুলোর আবহাওয়া ও মশার প্রজননের প্রভাব থাকতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ নিশ্চিত করতে আরও বিস্তারিত রোগতাত্ত্বিক তথ্য প্রয়োজন।
প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা মারার ওষুধ ছিটানো যথেষ্ট নয়। বাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। ফুলের টব, পানির পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার এবং ডাবের খোসায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করা প্রয়োজন। জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্টের মতো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা, নতুন রোগী ভর্তির উচ্চ সংখ্যা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণহানির ঘটনা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগী শনাক্ত এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও স্থানীয় পর্যায়ের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানো কঠিন হবে।
আ.দৈ/এসআর




















