সুপার এল নিনোর প্রভাব
এবার দেরিতে আসবে কি শীত, ঠান্ডা কম পড়ার শঙ্কা?
শাহীন রহমান

সুপার এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াবিদদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এর প্রভাব দেশের আসন্ন শীত মৌসুমেও পড়তে পারে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল। প্রশ্ন উঠেছে, এবার কি শীত আসতে দেরি হবে? নাকি শীতের মৌসুমে তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকবে? আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা বলছে, এল নিনো বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে শুধু এ প্রাকৃতিক ঘটনাকে শীত দেরিতে আসা কিংবা শীতের তীব্রতা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শীতের প্রভাব বিস্তার করতে পারে। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় এর আগেই শীতের অনুভূতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিসেম্বরের শেষভাগ থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে। তবে আবহাওয়ার পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে এ সময়সূচিতে কিছুটা হেরফের হতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাসে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে এল নিনো পরিস্থিতি শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ফলে আসন্ন শীত মৌসুমে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা পর্যবেক্ষণে রাখছেন আবহাওয়াবিদেরা।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর ফলে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, খরা ও ঝড়ের ধরনে তারতম্য দেখা দিতে পারে।
সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গেলে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ‘সুপার এল নিনো’ বলতে সাধারণত অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়। তবে এটি কোনো সর্বজনস্বীকৃত আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগ নয়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ২০২৬ সালের অক্টোবরের পূর্বাভাসে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পূর্বাভাসকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ ও হালনাগাদ পূর্বাভাস বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এল নিনো কি বাংলাদেশের শীত পিছিয়ে দিতে পারে?
এল নিনোর কারণে বাংলাদেশের শীত দেরিতে শুরু হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই। কারণ, বাংলাদেশের শীতের ধরন নির্ধারণে একাধিক আবহাওয়াগত উপাদান কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শীতল বায়ুপ্রবাহ, বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতি, ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলীয় চাপের বিন্যাস এবং পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব। এসব উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের আগমন, স্থায়িত্ব ও তীব্রতা নির্ধারিত হয়।
এল নিনো এসব বৃহত্তর বায়ুমণ্ডলীয় ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু তার প্রভাব বাংলাদেশে ঠিক কীভাবে পড়বে, তা নির্ভর করে অন্যান্য জলবায়ুগত পরিস্থিতির ওপরও। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়লেই বাংলাদেশে শীত দেরিতে আসবে—এমন সরল সমীকরণ টানা ঠিক হবে না।
শীতের তীব্রতা কি কমে যেতে পারে?
এবারের শীত তুলনামূলক উষ্ণ হতে পারে কি না, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে। এল নিনো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বৈশ্বিক তাপমাত্রার প্রবণতা এবং বাংলাদেশের নির্দিষ্ট অঞ্চলের শীতের তীব্রতা এক বিষয় নয়। কোনো মৌসুমে গড় তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকলেও কয়েক দিনের জন্য তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। আবার শীতের শুরু দেরিতে হলেও জানুয়ারি মাসে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। তাই পুরো মৌসুমের গড় তাপমাত্রা, শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন দেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে পঞ্চগড়, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের মতো এলাকায় শীতের প্রভাব সাধারণত আগে অনুভূত হয়। অন্যদিকে, উপকূলীয় অঞ্চল এবং রাজধানী ঢাকায় শীতের অনুভূতি ভিন্ন হতে পারে। এ কারণে সারা দেশের জন্য একই ধরনের পূর্বাভাস প্রযোজ্য নয়।
তাদেও মতে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে শীতের প্রভাব বাড়তে পারে। তবে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় এর আগেই তাপমাত্রা কমতে শুরু করতে পারে। ডিসেম্বরের শেষভাগ থেকে জানুয়ারিতে শীতের তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় উত্তরাঞ্চল ও নদীবিধৌত এলাকায় কুয়াশা এবং শৈত্যপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে শৈত্যপ্রবাহ কতবার হবে, কত দিন স্থায়ী হবে কিংবা তাপমাত্রা কতটা নিচে নামবে, তা নির্ভর করবে ওই সময়ের আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর। এ ছাড়া ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বেলায় সূর্যের আলো কম পৌঁছালে তাপমাত্রা ও শীতের অনুভূতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। কৃষি, নৌ ও সড়ক যোগাযোগ এবং বিমান চলাচলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
নজর থাকবে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের দিকে
বাংলাদেশের শীতের পূর্বাভাস তৈরিতে প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনোর পাশাপাশি ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা এবং বায়ুপ্রবাহের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু গবেষণায় দেখা যায়, এসব অঞ্চলের পারস্পরিক সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি আবহাওয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে আবহাওয়াবিদেরা শুধু এল নিনোর পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর না করে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলীয় চাপ, বাতাসের গতিপ্রকৃতি এবং স্বল্পমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসও বিশ্লেষণ করেন। বিশেষজ্ঞদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের প্রভাব। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে প্রতি বছর শীতের তীব্রতা কমবে।
আ.দৈ/এসআর




















