সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
ই-পেপার

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
দেশে বছরে প্রায় ২৭ হাজার অগ্নিকাণ্ড, আর্থিক ক্ষতি ৬শ’ কোটি টাকার বেশি
বৈদ্যুতিক ত্রুটি, অগ্নিনিরাপত্তায় অবহেলা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ বড় কারণ; প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারির তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
শাহীন রহমান
প্রকাশ: রোববার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:২৪ পিএম  আপডেট: ১৮.১০.২০২৬ ৬:৩৪ পিএম  (ভিজিট : ১১)
X

দেশে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে বাড়ছে প্রাণহানি, সম্পদহানি ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। রাজধানীর পুরান ঢাকার বাজার থেকে গাজীপুরের শিল্পকারখানা, আবার কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্র—কোনো এলাকাই আগুনের ঝুঁকির বাইরে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি এবং উদ্ধারকাজের জটিলতা নতুন করে সামনে এনেছে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা।
 
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বছরে প্রায় ২৭ হাজার অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। বৈদ্যুতিক ত্রুটি, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা, অপরিকল্পিত স্থাপনা, দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ সংরক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধারকাজে প্রতিবন্ধকতা এসব ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে তুলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, আগুন নেভানোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর দেয়া এখন জরুরি।

গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। সর্বশেষ আহতদের মধ্যে পাঁচজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আগুনে তিনতলা ভবনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি আগে অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই চালু ছিল। আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে তদন্ত চলছিল। এই ঘটনা পর্যটনকেন্দ্র ও আবাসিক স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এর আগে ১২ ও ১৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার চকবাজারে মঞ্জুর খান প্লাজা মার্কেটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট কাজ করে। প্রায় ১২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও সরু রাস্তা, ঘন ধোঁয়া, পানির সীমাবদ্ধতা ও গুদামে রাখা বিপুল পণ্যের কারণে উদ্ধারকাজে জটিলতা তৈরি হয়। এ ঘটনায় চারজন ফায়ার সার্ভিসকর্মী অসুস্থ হন। প্রাথমিক প্রতিবেদনে বেসামরিক প্রাণহানির খবর না থাকলেও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

গত ১৪ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ওষুধ উৎপাদন কারখানায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে চার ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবি সহায়তা দেয়। শিল্পকারখানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এমন ঘটনা উৎপাদন কার্যক্রম, সম্পদ ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বছরে প্রায় ২৭ হাজার অগ্নিকাণ্ড

ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ি  ২০২৩ সালে দেশে ২৭ হাজার ৬২৪টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এসব ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৯২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা কমে ২৬ হাজার ৬৫৯টিতে দাঁড়ায় এবং ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে আবার বেড়ে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৫৯টিতে। ওই বছর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৬৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এ বছর এখন পর্যন্ত একাধিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা একাধিক প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক।
যদিও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে বাড়েনি। তবে এখন তা উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় ঘটনা ও আর্থিক ক্ষতি—দুটিই বেড়েছে। ২০২৫ সালের ক্ষতির পরিমাণ ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। ফলে শুধু অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা নয়, আগুনের তীব্রতা, স্থাপনার ধরন, উদ্ধারকাজের প্রতিবন্ধকতা এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বৈদ্যুতিক ত্রুটি বড় ঝুঁকি

ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৯ হাজার ৩৯২টি অগ্নিকাণ্ডের কারণ ছিল বৈদ্যুতিক ত্রুটি, যা ওই বছরের মোট ঘটনার প্রায় ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, নিম্নমানের সরঞ্জাম, অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক লোড এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আগুনের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র না থাকা এবং জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ থাকলে প্রাণহানির আশঙ্কা বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, সরু সড়ক এবং গুদাম ও কারখানায় দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ ব্যবহারও বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। পুরান ঢাকার মতো এলাকায় আগুন লাগার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হয় এবং ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারে।

ঢাকায় বেশি অগ্নিকাণ্ড

২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক ৭ হাজার ১৭৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ঘনবসতি, বাজার ও গুদামের আধিক্য, শিল্পকারখানার উপস্থিতি এবং সড়কের সীমাবদ্ধতার কারণে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মার্চ ও এপ্রিল মাসে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারির তাগিদ

বিশেষজ্ঞদের মতে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদারে নিয়মিত পরিদর্শন, বিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা, সচল অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ভবনের জরুরি বহির্গমন পথ খোলা রাখা, দাহ্য পদার্থ নিরাপদে সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত পানির উৎস নিশ্চিত করা এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখাও জরুরি।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরিন জুনায়েদ বলেন আগুন লাগার পর তা নেভানোর চেয়ে আগুন লাগা প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও দেখাচ্ছে, অগ্নিনিরাপত্তা কেবল উদ্ধারকারী সংস্থার দায়িত্ব নয়; ভবনমালিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা পরিচালনাকারী ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে বছরে হাজার হাজার অগ্নিকাণ্ড ও শত শত কোটি টাকার ক্ষতির প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সতর্কবার্তাকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার নিয়মিত তদারকি এবং নিরাপত্তাবিধি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা না গেলে একই ধরনের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।



আ.দৈ/এসআর
















Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝