তুচ্ছ ঘটনায় প্রাণহানি, বাড়ছে অপরাধের নৃশংসতা
শাহীন রহমান

চুরি, ছিনতাই কিংবা সামান্য বিরোধ—অপরাধের কারণ হিসেবে সামনে আসছে এমন কিছু ঘটনা, যার পরিণতি কখনো কখনো গড়াচ্ছে প্রাণহানিতে। কুমিল্লার কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড এবং খুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে মারধরের পর মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, সমাজে অপরাধের ধরন কি শুধু বাড়ছেই না, এর সঙ্গে বাড়ছে সহিংসতার মাত্রাও।
কুমিল্লার ঘটনায় ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমের মরদেহ শনিবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের পাদদেশের একটি নির্জন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে রোববার কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান দাবি করেন, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে ফোনটি উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন।
অন্যদিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকার একটি মেসে চুরির অভিযোগ তুলে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে মারধরের পর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, তাকে মেস ভবনের চারতলার ছাদে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে তিনি নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় চার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একটি বিষয় একই—অপরাধের অভিযোগ বা সম্পদ নিয়ে বিরোধের জেরে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা আইনগত প্রক্রিয়ার বদলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেরাই শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা সমাজের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অপরাধের সামগ্রিক চিত্র নিয়েও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটির (বিসিআরএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড, ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, সংবাদমাধ্যম ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে এসব হিসাব তৈরি করা হয়েছে এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ সব ঘটনা থানায় নথিভুক্ত হয় না। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি ও অপহরণের মামলা আগের ছয় মাসের তুলনায় কমেছে। একই সময়ে হত্যা, দাঙ্গা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা বেড়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগের মতে, অভ্যাসগত অপরাধীরা সুযোগ পেলে বারবার অপরাধে জড়ায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রত্যাশিতভাবে সক্রিয় না থাকলে অপরাধীরা সেই সুযোগ আরও বেশি পায় বলে তিনি মনে করেন। অপরাধবিজ্ঞানী অধ্যাপক জিয়া রহমান তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে মাদক, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং নেতৃত্বের দুর্বলতার মতো বিষয়গুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, মাদকাসক্তির সঙ্গে অর্থের প্রয়োজন তৈরি হলে কেউ কেউ অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বিচ্যুত তরুণদের সমাজে ফিরিয়ে আনতে কাউন্সেলিং ও সামাজিক উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থার দুর্বলতাকে মব সহিংসতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার একটি কারণ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকরভাবে সক্রিয় না থাকলে বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে জনতাকে সংগঠিত করে সহিংসতায় জড়াতে পারে। সম্প্রতি অপরাধ ও ছিনতাই নিয়ে আলোচনায় তিনি বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, শুধু গ্রেপ্তার অভিযান দিয়ে অপরাধ কমানো সম্ভব নয়; অপরাধপ্রবণ এলাকায় কাউন্সেলিং, শিক্ষার মানোন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং সামাজিক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগও প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদেও মতে শুধু অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি নয়, অপরাধের সামাজিক কারণ দূর করা এবং একই সঙ্গে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ঠেকানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ চুরি বা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার, তেমনি অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকারও ব্যক্তির হাতে নেই। অপ্রতিম ও আজমুলের মৃত্যুর ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে—অপরাধ দমন করতে গিয়ে যদি সমাজই বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে অপরাধের পাশাপাশি সহিংসতার সংস্কৃতিও আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
আ.দৈ/আরএস




















