শরতের ভোরেই কুয়াশার চাদর, উত্তরে শীতের আগমনী বার্তা!
নিজস্ব প্রতিবেদক

শরৎ এখনো ঠিকমতো পেরোয়নি। মাঠে-ঘাটে বর্ষার রেশ, দিনের বেলায় তীব্র গরম। অথচ ভোর হতেই যেন বদলে যাচ্ছে উত্তরের জনপদের চেনা চিত্র। চারদিকে সাদা কুয়াশার চাদর। কয়েক হাত দূরের দৃশ্যও ঝাপসা। সড়কে যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে, চালকদের জ্বালাতে হচ্ছে হেডলাইট। পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে ভোরের প্রকৃতিতে এমনই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শরতের শুরুতেই কুয়াশার এই উপস্থিতিকে অনেকেই দেখছেন শীতের আগাম বার্তা হিসেবে।
মঙ্গলবার ভোরে পঞ্চগড়ের গ্রাম থেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢাকা। সড়কের পাশে থাকা গাছপালা কিংবা দূরের বাড়িঘরও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে অনেক চালক হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে গাড়ি চালান। তবে সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের দেখা মেলে। ধীরে ধীরে পাতলা হতে থাকে কুয়াশার আস্তরণ। একপর্যায়ে স্বাভাবিক হয়ে আসে চারপাশের পরিবেশ।
শরতেই শীতের অনুভূতি
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া বরাবরই দেশের শীতপ্রবণ এলাকাগুলোর একটি। তবে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই এমন কুয়াশা স্থানীয়দের কাছেও কিছুটা বিস্ময়ের। কামাত কাজলদিঘী ইউনিয়নের গলেহা কান্তমনি এলাকার বাসিন্দা আইবুল ইসলাম মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা দেখতে পান। তাঁর ভাষায়, কয়েক হাত দূরের কোনো কিছুই তখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। সেপ্টেম্বর মাসে এত ঘন কুয়াশা এর আগে দেখেছেন কি না, তা মনে করতে পারছেন না তিনি।
জেলা শহরের ইজিবাইকচালক আজিজুল ইসলামের সকালটাও শুরু হয় কুয়াশার সঙ্গে লড়াই করে। গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়েও সামনের রাস্তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। তাই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম গতিতে গাড়ি চালাতে হয়েছে তাঁকে। উত্তরের অন্য জনপদেও একই চিত্র। কুড়িগ্রামের রৌমারীর চরাঞ্চলের আটোচালক জেল হোসেন জানান, ভোরে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে পুরো এলাকা কুয়াশায় ঢেকে থাকতে দেখেছেন। তাঁর ধারণা, এবারের গরম যেমন তীব্র হয়েছে, শীতও হয়তো তেমনই তীব্র হতে পারে।
রংপুরের গঙ্গাচড়ার চর ইসলির কৃষক আমজাদ হোসেনের কাছে কুয়াশা মানে এখন বাড়তি দুশ্চিন্তা। গত এক সপ্তাহ ধরে ভোরে ঘন কুয়াশা থাকায় জমিতে কাজ করতে বের হতেও তাঁর ভয় লাগছে। লালমনিরহাটের চর রাজপুরের গৃহবধূ রাবেয়া খাতুনের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। তাঁর ভাষায়, দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম আর ভোরে ঘন কুয়াশা—আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিক ওঠানামায় পরিবারের সদস্যদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
কেন এই কুয়াশা?
আবহাওয়াবিদদের মতে, শরতের শুরুতে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে আবহাওয়ায়। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় আকাশে মেঘ থাকা এবং হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়াও ভোরে কুয়াশা তৈরির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, গত এক সপ্তাহে তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ছিল। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় সেখানে ২৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এর আগের দিন সোমবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলছেন, ভোরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও হালকা শীতের অনুভূতি পাওয়া যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
কুয়াশায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
আবহাওয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়ার মতো সমস্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ জানান, প্রতিদিনই শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে অনেক শিশু প্রচণ্ড জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুদের সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় এখন ভোরের দৃশ্য অনেকটাই একই—কুয়াশায় ঢাকা পথ, ধীরগতির যানবাহন আর সূর্যের অপেক্ষায় থাকা মানুষ। দিনের তীব্র গরম এখনো শীতের আগমনের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবু ভোরের কুয়াশা যেন প্রকৃতির ভাষায় আগাম জানিয়ে দিচ্ছে—ঋতুর পালাবদল শুরু হয়েছে। উত্তরের জনপদে শরতের ভোরেই তাই শোনা যাচ্ছে শীতের পদধ্বনি।
আ.দৈ/এসআর




















