এফওপিএল
শুধু প্যাকেটে সতর্কবার্তা নয়, খাদ্যশিল্পের পণ্য সংস্কারেরও হাতিয়ার
শাহীন রহমান

অতি-প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ক্ষতিকর চর্বি গ্রহণ কমাতে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে ‘ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং’ বা এফওপিএল। পণ্যের পেছনে থাকা জটিল পুষ্টি তথ্যের বদলে মোড়কের সামনের অংশে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা দিয়ে ভোক্তাকে জানানোই এ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এফওপিএল কেবল ভোক্তাকে সতর্ক করার ব্যবস্থা নয়; কার্যকর ও বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি খাদ্যশিল্পকে পণ্যের উপাদান ও পুষ্টিমান পরিবর্তন বা ‘রিফর্মুলেশন’-এর দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এফওপিএলকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে। সংস্থাটির মতে, সহজে বোঝা যায় এমন সামনের লেবেল ভোক্তাকে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে সহায়তা করার পাশাপাশি খাদ্যশিল্পকে পণ্য সংস্কারে উৎসাহিত করতে পারে।
দেশেও এ নিয়ে নীতিগত অগ্রগতি হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব এ বিষয়ে বলেন, এফওপিএল-সংক্রান্ত খসড়া প্রবিধানমালা খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে এবং প্রক্রিয়া শেষে তা দ্রুত চূড়ান্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা চালু হলে তা কীভাবে কার্যকর করা হবে এবং সম্ভাব্য বাধাগুলো কী এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সতর্কবার্তা থেকে পণ্য সংস্কার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন এফওপিএলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সম্ভাব্য ‘রিফর্মুলেশন ইফেক্ট’। কোনো পণ্যে সামনের অংশে ‘অতিরিক্ত চিনি’, ‘অতিরিক্ত লবণ’ বা ‘অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বি’ লেখা থাকলে তা ভোক্তার কাছে পণ্যটির স্বাস্থ্যঝুঁকি দৃশ্যমান করে। একই সঙ্গে নির্মাতার জন্যও এটি বাজারগত চাপ তৈরি করে। কোম্পানি যদি সতর্কবার্তা এড়াতে পারে, তাহলে পণ্যের চিনি, লবণ বা চর্বির পরিমাণ কমিয়ে নির্ধারিত সীমার নিচে নামানোর প্রণোদনা পেতে পারে।
খাদ্যশিল্পের ওপর এফওপিএলের প্রভাব নিয়ে একটি সিস্টেমেটিক রিভিউয়ে ২৬টি গবেষণায় পণ্য সংস্কারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে সোডিয়াম, চিনি ও ক্যালরি কমানোর প্রবণতা। গবেষণাটিতে আরও দেখা যায়, বাধ্যতামূলক এফওপিএল স্বেচ্ছামূলক ব্যবস্থার তুলনায় পণ্য সংস্কারে বেশি ধারাবাহিক প্রভাব ফেলেছে। সিস্টেমেটি রিভিউয়ে চিলির বাধ্যতামূলক এফওপিএল ব্যবস্থার পর চিনি, ক্যালরি, সোডিয়াম ও সম্পৃক্ত চর্বি কমানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন্ এফওপিএলের প্রভাব শুধু বাজারে ক্রেতার সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি খাদ্য উৎপাদনকারীর সিদ্ধান্তেও পরিবর্তন আনতে পারে।
চিলি ও লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা
তারা বলছেন এফওপিএল বাস্তবায়নের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি চিলি। দেশটিতে নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি চিনি, সোডিয়াম, সম্পৃক্ত চর্বি ও ক্যালরিযুক্ত পণ্যের জন্য সামনের অংশে সতর্কবার্তা চালুর পাশাপাশি শিশুদের লক্ষ্য করে খাদ্য বিপণন ও কিছু বিক্রয়সংক্রান্ত বিধিনিষেধও নেয়া হয়। চিলির অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণায় পণ্যের পুষ্টিমান পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে যেসব পণ্য নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করত, সেসব পণ্যে চিনি, সোডিয়াম, ক্যালরি ও সম্পৃক্ত চর্বি কমানোর প্রবণতা দেখা গেছে। তারা বলেন এই উদাহরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। এফওপিএলকে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে বৃহত্তর খাদ্যনীতি ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য কোন লেবেল বেশি কার্যকর?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশেই গবেষণা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক ও কিশোরদের মধ্যে চার ধরনের এফওপিএল ওয়ানিং লেবেল. হেলথ স্টার রেটিং, মাল্টিপল ট্রাফিক লাইট গেজ গাইডলাইন ডেইলি এমাউন্ট পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সতর্কতামূলক লেবেল বা বহু রঙের ট্রাফিক-লাইট লেবেল ভোক্তার কাছে অস্বাস্থ্যকর পণ্য শনাক্ত করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝা এবং পণ্য গ্রহণের ইচ্ছা কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখিয়েছে। গবেষকরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাধ্যতামূলক সতর্কতামূলক লেবেল ব্যবস্থাকে সম্ভাবনাময় নীতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশের শহরে ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর করা আরেকটি কোয়ালিটেটিভ গবেষণাতেও অংশগ্রহণকারীরা সতর্কতামূলক লেবেলকে তুলনামূলকভাবে সহজবোধ্য বলে মনে করেছেন। বিশেষ করে অক্টাগন আকৃতি ও সতর্কবার্তা-ভিত্তিক ডিজাইন ভোক্তাদের কাছে সহজে বোধগম্য হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
আইন করলেই কি কাজ শেষ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এফওপিএল কার্যকর করতে হলে শুধু প্রবিধান তৈরি করলেই হবে না; কোন পণ্যে সতর্কবার্তা লাগবে, কত মাত্রায় চিনি বা লবণ থাকলে সেটিকে ‘হাই ইন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, কী ধরনের লেবেল ব্যবহার হবে এবং আইন ভাঙলে কী শাস্তি হবে এসব স্পষ্ট করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্রেসহোল্ড বা সীমারেখা নির্ধারণ হবে নীতিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সীমা খুব বেশি হলে বিপুল সংখ্যক অস্বাস্থ্যকর পণ্য সতর্কবার্তা এড়িয়ে যেতে পারে। আবার সীমা অত্যন্ত কম হলে বাজারের বিপুলসংখ্যক পণ্যে সতর্কবার্তা দেখা যেতে পারে এবং লেবেলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ ছাড়া খাদ্যপণ্যের পুষ্টিমান যাচাই, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, বাজার তদারকি এবং আইন প্রয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার পর্যাপ্ত জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন হবে।
শিল্পের বিরোধিতা হতে পারে বড় বাধা
তারা বলছেন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এফওপিএল চালুর ক্ষেত্রে খাদ্যশিল্পের বিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। শিল্পের পক্ষ থেকে সাধারণত যুক্তি দেয়া হয় লেবেল অতিরিক্ত সরলীকরণ করে, ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে অথবা শুধু একটি-দুটি পুষ্টি উপাদান দিয়ে পুরো খাবারের স্বাস্থ্যমান বিচার করা ঠিক নয়। ভারতের সাম্প্রতিক ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই বা ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান কর্তৃপক্ষ প্যাকেটের সামনের অংশে চিনি, লবণ ও চর্বির মাত্রা বোঝাতে রঙিন সতর্কবার্তা দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু বড় খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলোর তীব্র আপত্তির পর কর্তৃপক্ষ সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান সাদা-কালো পুষ্টি তথ্যের দিকে এগিয়েছে।
বিষয়টি এখন ভারতের সুপ্রিম কোর্টেরও নজরে রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, শিল্পপক্ষ সতর্কবার্তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং অংশ নিয়েছিল নীতিনির্ধারণী আলোচনায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, এ ধরনের শিল্প-লবিং শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য নীতি গ্রহণকে বিলম্বিত করতে পারে। তারা বলছেন বাংলাদেশেও এফওপিএল প্রবিধান চূড়ান্ত করার সময় শিল্পের পক্ষ থেকে একই ধরনের আপত্তি আসতে পারে। ফলে নীতিমালা তৈরিতে স্বচ্ছতা, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া গুরুত্বপূর্ণ।
স্বেচ্ছামূলক নাকি বাধ্যতামূলক
তারা বলছেন এটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক গবেষণার ফল এখানে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। স্বেচ্ছামূলক লেবেলিংয়ে অনেক সময় অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যকর পণ্যই লেবেল গ্রহণ করে। ফলে বাজারের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যগুলো লেবেলের আওতার বাইরে থেকে যাওয়ার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা পুরো বাজারে একই নিয়ম প্রয়োগ করতে পারে। গবেষণায়ও বাধ্যতামূলক এফওপিএলকে পণ্য সংস্কারের ক্ষেত্রে বেশি ধারাবাহিক পাওয়া গেছে। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক, সহজবোধ্য এবং বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত সতর্কতামুলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন।
শুধু লেবেল দিয়ে অসংক্রামক রোগ কমবে না
যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন এফওপিএলকে অবশ্যই একটি বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ লেবেল দেখে ভোক্তা কোনো পণ্য না কিনলেও যদি স্বাস্থ্যকর বিকল্পের দাম বেশি হয়, অথবা স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও আশপাশের বাজারে অস্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা বেশি থাকে, তাহলে কাঙ্খিত পরিবর্তন সীমিত হতে পারে।ফলে এফওপিএলের সঙ্গে শিশুদের লক্ষ্য করে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, স্কুলে স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করা, পণ্যের নিউট্রিশন ক্লেইম নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক নীতির সমন্বয় প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এফওপিএলকে একটি সাপ্লিমেন্টারি নিউট্রিশন ইনফরমেশন বা সহায়ক পুষ্টি-তথ্য ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ এটি বৃহত্তর স্বাস্থ্যকর খাদ্যনীতির একটি অংশ, একক সমাধান নয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাংলাদেশে এফওপিএল নিয়ে নীতিগত আলোচনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশি ভোক্তাদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় সতর্কতামুলক ব্যবস্থার কার্যকারিতার পক্ষে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে লেবেলের নকশা সহজ হবে, পুষ্টিমান নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড থাকবে, সব কোম্পানির জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে এবং বাজার তদারকি ও শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
একই সঙ্গে নীতিমালা তৈরির সময় খাদ্যশিল্পের মতামত শোনা হলেও সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও জনস্বাস্থ্য।
তারা বলছেন এফওপিএলকে শুধু প্যাকেটের সামনে কয়েকটি সতর্কবার্তা বসানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনার বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাবে। কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি একদিকে ভোক্তাকে দ্রুত ও সহজে খাদ্যের ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে কোম্পানিকে চিনি, লবণ, ক্যালরি ও ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা কমিয়ে পণ্য সংস্কারে উৎসাহিত করতে পারে।
আ.দৈ/এসআর




















