মহম্মদপুরে মধুমতির ভয়াবহ রূপ তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ভিটেমাটি, হুমকিতে মসজিদ-মাদ্রাসা-ঈদগাহ
মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে মাগুরার মহম্মদপুরে মধুমতি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনের তীব্রতাও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একের পর এক বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন নদীপাড়ের শত শত পরিবার। অনেকেই গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ ও তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এর প্রভাব বর্ষা মৌসুমে আরও প্রকট হয়ে দেখা দেয়। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধুমতি নদী তীব্র স্রোতে ফসলি জমি, গাছপালা ও বসতবাড়ি গ্রাস করছে।
উপজেলার উত্তরে চরসেলামতপুর থেকে দক্ষিণে কালিশংকরপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে মহম্মদপুর ইউনিয়নের কাশীপুর গ্রামের সিনদাইন গোরস্থান এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে এ এলাকায় প্রায় ২০০ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। নদীভাঙন আর মাত্র প্রায় আধা কিলোমিটার এগিয়ে গেলে হুমকির মুখে পড়বে দুটি মসজিদ, শহীদ আবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মহম্মদপুরের বৃহৎ ঈদগাহ ময়দান, বৃহৎ গোরস্থান, একটি দাখিল মাদ্রাসা, একটি হেফজখানা ও একটি হাফেজী মাদ্রাসা।
এদিকে গোপালনগর, মহেষপুর, হরেকৃষ্ণপুর, ঝামা, চরঝামা, আড়মাঝি, যশোবন্তপুর, চরপাচুড়িয়া, রায়পুর, মুরাইল, ধুপুড়িয়া, জাঙ্গালিয়া, রুইজানি, কাশীপুর, ধুলজুড়ি, দ্বিগমাঝি, দেউলি ও ভোলানাথপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের শত শত পরিবার ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, ঈদগাহ, মন্দির, দোকানপাট ও বাজার।
নদীভাঙনের খবর পেয়ে গত ১৯ আগস্ট ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বেদবতী মিস্ত্রী। এ সময় তিনি ৩০ মিটার জিওব্যাগ ডাম্পিং এলাকা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
এ সময় মুক্তিযোদ্ধা মোঃ তিলাম হোসেন ইউএনও বেদবতী মিস্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, “হরেকৃষ্ণপুরের পাশাপাশি কাশীপুরের সিনদাইন গোরস্থান এলাকাটিও একবার দেখে যান। সময় থাকতে ব্যবস্থা নিলে হয়তো একটি গ্রাম ও কয়েকশ মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করা সম্ভব হবে।”
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পাড়ে বসে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। এবারের ভাঙনে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে ১০ থেকে ১২ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পাঁচবার বাড়ি সরাতে হয়েছে হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের তহিদুল ইসলাম লিপন ও তার স্ত্রী নাসরিন সুলতানাকে। এবছরও ভাঙনের আশঙ্কায় পাশের জমিতে সাময়িকভাবে ঘর তুলে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন তারা।
হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের স্বামীহারা নুর নাহার বলেন, “বর্ষা মৌসুম এলেই আমাদের চিন্তার শেষ থাকে না। চারবার বাড়ি সরিয়েছি। ফসলি জমি ও গাছপালা হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছি।”
ভ্যানচালক মোঃ ইনামুল শেখ বলেন, “তিনবার বাড়ির ভিটা নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন নিজের কোনো জমি নেই। অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকি। ভ্যান চালিয়ে টেনেটুনে সংসার চালাচ্ছি।”
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকার সচেতন মহল বলছেন, শুধু সাময়িকভাবে জিওব্যাগ ডাম্পিং করে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীভাঙন রোধে দ্রুত টেকসই ও স্থায়ী নদীশাসন বাঁধ নির্মাণ এবং ভাঙনে ভূমিহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মধুমতির ভাঙনে আরও বহু পরিবার, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।




















