
শীতের আমেজ আসতে এখনো বাকি। তার আগেই পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে দেখা মিলছে বরফে ঢাকা হিমালয়ের অন্যতম উঁচু শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার। আগস্টের শুরু থেকেই মেঘমুক্ত আকাশ ও অনুকূল আবহাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে খালি চোখে দেখা যাচ্ছে দূরের এই পর্বতচূড়া। কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তেঁতুলিয়ায় ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকেরা।
সাধারণত সেপ্টেম্বরের দিকে পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান হয়। তবে এবার নির্ধারিত সময়ের এক মাসেরও বেশি আগে দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি উৎসাহ। ভোরের কোমল আলো কিংবা বিকেলের শেষ সূর্যরশ্মি বরফে ঢাকা চূড়ায় পড়লে বদলে যায় এর রং। কখনো শুভ্র সাদা, কখনো গোলাপি, আবার কখনো লালচে আভায় ধরা দেয় পর্বতটি। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঘ ও কুয়াশার কারণে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায় সেই দৃশ্য।
স্থানীয় বাসিন্দা মশিউর রহমান জানান, সকালে মাঠে কাজ করার সময় হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পান। এত পরিষ্কারভাবে পর্বতচূড়া সবসময় দেখা যায় না বলে জানান তিনি। রাবিক আল হাসানের মতে, আগস্টের শুরু থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান হওয়ায় এবার পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এতে তেঁতুলিয়ার স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
পঞ্চগড়ের গণমাধ্যমকর্মী সরকার হায়দার বলেন, প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেলেও এবার আগস্টের শুরুতেই তা দৃশ্যমান হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দর্শনার্থীরা তেঁতুলিয়ায় আসতে শুরু করেছেন।
দিনে কাঞ্চনজঙ্ঘা, সন্ধ্যায় পাহাড়ের আলো
তেঁতুলিয়ায় পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশও দর্শনার্থীদের টানে। বিশেষ করে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো এলাকা থেকে সন্ধ্যার পর ভারতের দার্জিলিং ও শিলিগুড়ির পাহাড়ি এলাকার আলোকসজ্জা দেখা যায়। দিনের আলোয় দূরে বরফঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা আর সন্ধ্যায় পাহাড়ি জনপদের ঝলমলে আলো—দুই ভিন্ন সৌন্দর্য পর্যটকদের জন্য তৈরি করেছে আলাদা অভিজ্ঞতা।
ভৌগোলিক অবস্থানও পঞ্চগড়ের পর্যটন সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর থেকে নেপাল প্রায় ৬১ কিলোমিটার, ভুটান ৬৪ কিলোমিটার, দার্জিলিং ৫৮ কিলোমিটার এবং শিলিগুড়ি প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সীমান্তবর্তী এই জেলার প্রতি পর্যটকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
পর্যটন গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য মানুষের কাছে সবসময়ই আকর্ষণীয় হলেও কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক আলাদা। সাধারণত শীতের আগমনে এই পর্বতচূড়া দেখা গেলেও এবার এত আগেই দৃশ্যমান হওয়া বিস্ময়কর। যারা দেশের বাইরে গিয়ে পাহাড় দেখার সুযোগ পান না, তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে পঞ্চগড়ে এসে দূর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, উত্তরাঞ্চলে নিজস্ব পাহাড় বা পর্বত না থাকায় দূর থেকে হলেও হিমালয়ের এই বরফঢাকা শৃঙ্গ দেখার সুযোগ স্থানীয়দের পাশাপাশি দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষের জন্যও বিশেষ আনন্দের।
পরিষ্কার আকাশেই মিলবে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিষ্কার আকাশ। মেঘমুক্ত আবহাওয়া থাকলে ভোর কিংবা বিকেলের দিকে তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে দূর দিগন্তে চোখ রাখলেই দেখা মিলতে পারে বরফে ঢাকা পর্বতচূড়ার। ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যেতে ট্রেন ও বাস—দুই ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তনগর একতা, দ্রুতযান ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনে যাওয়া যায়। ট্রেনভেদে ভাড়া প্রায় ৬৯৫ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। এ ছাড়া গাবতলী থেকেও দূরপাল্লার বাসে পঞ্চগড় যাওয়া যায়। বাসের ধরন অনুযায়ী ভাড়া প্রায় ৮৫০ থেকে ২ হাজার ৫০ টাকা।
পঞ্চগড় শহরে পৌঁছানোর পর বাস টার্মিনাল বা রেলস্টেশন থেকে স্থানীয় বাস, অটোরিকশা কিংবা প্রাইভেটকারে তেঁতুলিয়া, মহানন্দার তীর, ডাকবাংলো ও বাংলাবান্ধাসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাওয়া যায়। শীতের মৌসুম শুরুর আগেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাওয়ায় পঞ্চগড়ে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সামনে এই ভিড় আরও বাড়বে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ঘিরে আগাম এই পর্যটন উন্মাদনা একদিকে যেমন প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে, অন্যদিকে তেঁতুলিয়ার স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি আনতে পারে।




















