লালমনিরহাটে নির্মিত সেতুর উইং ভেঙে নির্মাণের নির্দেশ
মিজানুর রহমান, (লালমনিরহাট)

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)র রাস্তা সংস্কার ও সেতু নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে এলজিইডির টনক নড়ে, প্রাথমিক তদন্তে ত্রুটি ধরা পড়ায় সেতুর দুপাশের চার কোণার চারটি উইং (প্রোটেকশন পিলার) ভেঙে সিডিউল অনুযায়ী নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছে এলজিইডি। গত রোববার সকাল থেকে নব নির্মিত উইং প্রটেকশন ভেঙ্গে ফেলার কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বোর্ডেরহাট এলাকায় ৭ দশমিক ৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থের সেতুটির নির্মাণকাজ ত্রুটি থাকায় এলাকাবাসী আপত্তি জানানো স্বত্বেও গত ২০ জুন বিকেলে যান চলাচল ও জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কিন্ত উদ্বোধনের দিনই সেতুর চারটি উইংয়ে ফাটল দেখা দেয়।এতে সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয়রা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু করে,জাতীয় একাধিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়।
খবর পেয়ে এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে তদন্তের ভিত্তিতে চারটি উইং ভেঙে নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এলজিইডি সূত্র জানায়, হাতীবান্ধা উপজেলার দৈখাওয়া কলেজ থেকে ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের বুড়ির বাজার পর্যন্ত ৯ দশমিক ৩ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও একই সড়কে সম দৈর্ঘ্যের চারটি সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ১৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পান ঠিকাদার গোলাম মাওলা।
চুক্তি অনুযায়ী ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেতুগুলোর নির্মাণ শেষ হলেও এখনো সড়কের কার্পেটিং শুরু করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
বোর্ডেরহাট এলাকার বাসিন্দা নয়া মিঞা বলেন, সেতু নির্মাণে নিম্নমানের পথর, বালু এবং দরপত্র অনুযায়ী রডের ব্যাবহার না করে ঢালাই দেওয়ায় ব্রিজের কাজ নিম্নমানের হয়েছে। ফলে ব্রীজটি উদ্বোধনের দিনই ফাটল দেখা দেয়। অফিসের সঠিক তদারকি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফলতির কারনে পুরো প্রকল্পেই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে।
স্থানীয়রা প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে বারবার আপত্তি জানিয়ে আসলেও তদারকি প্রতিষ্ঠান এলজিইডি আর্থিক সুবিধা নিয়ে কোন আপত্তি আমলে না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন,এবং অভিযোগ করেন স্থানীয়দের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মামলার হুমকি দেয়।
সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী রাকিব উদ্দিন বলেন, সড়কটি সংস্কার ও নতুন ৪টি ব্রীজ নির্মান নিয়ে আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নকারী হাতীবান্ধা উপজেলা স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা দের অনিয়মের কারণে পুরো প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিরেপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পুরো প্রকল্পের যাচাই বাছাই করা প্রয়োজন,তা না হলে এই প্রকল্পের সুফল জনগন বেশীদিন পাবে না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের ঠিকাদার গোলাম মাওলা বলেন, এ বিষয়ে যা বলার এলজিইডির প্রকৌশলী বলবেন। আমার কোনো মন্তব্য নেই।
তবে নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাতীবান্ধা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ঠিকাদার আমাদের না জানিয়ে ঈদের ছুটির সময় সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করেছেন। তখন আমাদের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এমনকি ঠিকাদার নিজ উদ্যোগে সেতুটি চালুও করেছেন। তিনি আরো বলেন, এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিকাদার নতুন করে উইং নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন। পুরো বিষয়টি আমি গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছি।
লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাওছার আলম আজকের দৈনিককে জানান, সেতুর মূল অবকাঠামো থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষায় যদি প্রমাণিত হয় যে নিম্নমানের অথবা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে পুরো সেতু ভেঙে নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হবে বলে জানান।
নির্বাহী প্রকৌশলী কাওছার আলম আরো বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঠিকাদারকে সড়কের কার্পেটিং কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণের মান যাচাইয়ের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে এলজিইডির কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
আ. দৈ. /কাশেম/ জাকির




















