কক্সবাজারে ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯
চঞ্চল দাশগুপ্ত, কক্সবাজার

কক্সবাজারে টানা ভারী বর্ষণের ফলে ভয়াবহ পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ জনে। এর মধ্যে কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারের ঘোনা এলাকায় একজন এবং উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নারী-শিশুসহ আটজন নিহত হয়েছেন। রোববার দিবাগত রাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত পৃথক কয়েকটি পাহাড়ধসের ঘটনায় এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আজ সোমবার (৬ জুলাই) ভোর প্রায় ৪টার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ছাত্তারের ঘোনা এলাকায় পাহাড়ের একটি অংশ ধসে একটি বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে আলী আকবর নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম জানান, পাহাড়ধসের সময় আলী আকবরসহ তাঁর পরিবারের তিন সদস্য মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত অপর দুইজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী আলী আকবরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজ চলছে। এদিকে, রাত ১টা থেকে ভোর ৩টার মধ্যে উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলী (ক্যাম্প-১৫) রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে আরও আটজনের মৃত্যু হয়।
রোহিঙ্গা নেতা আকতার কামাল জানান, রাত দেড়টার দিকে জামতলী আশ্রয়শিবিরের ডি-৬ ব্লকে পাহাড়ধসে কামাল হোসাইনের বসতঘর চাপা পড়ে। এতে কামাল হোসাইন , তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম এবং চার বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আনাস ঘটনাস্থলেই নিহত হন। একই ঘটনায় পরিবারের আরও দুই সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
অন্যদিকে, রাত ২টার দিকে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-৭) ডি-৭ ব্লকে পাহাড়ধসে রশিদ উল্লাহর সাত বছর বয়সী ছেলে মো. একরাম মারা যায়। এ ছাড়া রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-১১) সি-১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন নিহত হন। তারা হলেন—উম্মে হাবিবা (২৭), তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩), ভাই হারুনুর রশিদ (৩) ও মোহাম্মদ রিহান (৫)।
পাহাড়ধসের পর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), ফায়ার সার্ভিস এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অতি ভারী বৃষ্টির কারণে আরও পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ৩৪টি আশ্রয়শিবির নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার মানুষ ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি। এদিকে, রোববার দুপুর থেকে কক্সবাজারে টানা বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা চলতি মৌসুমের অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান আজকের দৈনিককে জানান, বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আগামী আরও দুই দিন একই ধরনের বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকা, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে ভূমিধসের আশঙ্কা বহাল রয়েছে। প্রশাসন ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আ. দৈ./কাশেম/ জাকির




















