অতিরিক্ত পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা
আবু সাঈদ রনি, রাজশাহী

পবিত্র ঈদুল আযহার বাকি আর দিন কয়েক। মুসলিম ধর্মালম্বীদের অন্যতম এই উৎসবকে সামনে রেখে রাজশাহীর পশুর হাটগুলোতে জমতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর বাজার। হাটে হাটে বাড়ছে গরু-ছাগলের আমদানি, তবে আশানুরূপ ক্রেতা না থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পশু থাকায় শেষ পর্যন্ত ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে তাদের মধ্যে।
রাজশাহী নগরীর সিটিহাট, নওহাটা, কাঁটাখালি, গোদাগাড়ীর মহিষালবাড়ি ও কাঁকনহাট, বাগমারার মচমইল, মোহনপুরের কেশরহাট এবং পুঠিয়ার বানেশ্বরসহ জেলার ১০টি বড় পশুর হাটে ইতোমধ্যে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশু। এর মধ্যে আয়তন ও বেচাকেনায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় হাট নগরীর সিটিহাটে সকাল থেকে বাড়তে দেখা গেছে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি। দূর-দূরান্ত থেকেও আসছেন ব্যাপারীরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার রাজশাহীতে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১১টি। এর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪১টি গরু, ৩ হাজার ৪২৫টি মহিষ, ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি ছাগল এবং ৪৩ হাজার ৪০৬টি ভেড়া। জেলায় সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি। সে হিসাবে জেলায় প্রায় ৯১ হাজার ৯৫৩টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত এসব পশু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবে।
আজ রোববার রাজশাহীর সিটি হাটে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা থেকে পশু নিয়ে হাটে ভিড় জমাচ্ছেন গরু ব্যবসায়ী ও খামারিরা। রাজশাহী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাক, পিকআপ ও থ্রি হুইলারে করে গরু বিক্রি করতে আসছেন খামারিরা। তবে ঈদের আরও বেশ কয়েকদিন বাকি থাকায় সেভাবে ক্রেতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি।
খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পশুর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও ক্রেতা কম। আগামী দুএকদিন পর বেচাকেনা একটু বাড়তে পারে। এতে ভালো দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আবার গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় এবার পশু লালন-পালনের খরচ অনেক বেড়েছে। ফলে তারা ন্যায্যমূল্য না পেলে লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
গোদাগাড়ী উপজেলার খামারি আব্দুর রহমান বলেন, রাজশাহীর সিটি হাটে মানুষের চেয়ে গরুর সংখ্যা অনেক বেশি, ফলে বেচাকেনা কম হচ্ছে। ঈদের আরও কিছুদিন বাকি হয়তো সামনে বেচাকেনা হবে। তবে অন্যান্য বছর এমন সময়ে বেচাকেনা জমজমাট থাকতো।
তানোরের খামারি সুব্রত পাল বলেন, প্রতি কেজি মাংসের দাম যদি ৮০০ টাকার মধ্যে না পাই, তাহলে আমাদের লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হবে। কারণ সব ধরনের গো খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। ফলে এ বছর পশু পালনের খরচ বেড়ে গেছে।
মোহনপুর উপজেলার কেশরহাটের খামারি রমজান ইসলাম বলেন, খাদ্য ও পরিচর্যা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এবার পশু উৎপাদনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। সেই তুলনায় বাজারে ক্রেতাদের সাড়া মিলছে না। তাই সরকারিভাবে বাজার মনিটরিং ও খামারিদের স্বার্থ রক্ষার দাবি জানান তিনি।
তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, হাটে অসাধু দালাল চক্র অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে পশুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে সাধারণ ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত দামে পশু কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ প্রকৃত খামারিরাও সেই লাভের অংশীদার হতে পারছেন না। এছাড়া কয়েকদিনের তীব্র গরমে হাটে আসা মানুষজনও ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ঢাকা থেকে গরু কিনতে আসা ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা বলেন, এবারও সিটি হাটে অনেক ভালো গরু আসছে। ছোট থেকে মাঝারি কিংবা বড় সব রকমের গরুই আছে। তবে দাম একটু বেশিই মনে হচ্ছে। আর গরমের কারণে বাধ্য হয়ে একটু বেশি দামে হলেও নিতে হচ্ছে।
ক্রেতা হিসেবে রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা মাহবুব আলম বলেন, হাটে এবার গরুর সংখ্যা অনেক বেশি। বিভিন্ন দামের ও আকারের গরু পাওয়া যাচ্ছে। তবে বিক্রেতারা এখনও তুলনামূলক বেশি দাম হাঁকাচ্ছেন। আমরা আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করে ভালো গরু কম দামে কেনার আশা করছি।
ক্রেতা পবা উপজেলার নোওল বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, এবার বাজারে দেশীয় গরুর সংখ্যা বেশি দেখছি, যা ভালো লাগছে। গরুগুলোও স্বাস্থ্যবান মনে হচ্ছে। তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগের মতো নেই, তাই বাজেটের মধ্যেই ভালো পশু খুঁজছেন সবাই।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান আজকের দৈনিককে জানান, স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন কাজ করছে। রাজশাহী অঞ্চলে এবার পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হাটগুলোতে নজরদারি ও মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।
আ.দৈ/আরএস




















