’বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সাত উপাচার্যের ৪ জনকেই অপসারণ
মশিউর রহমান তাসনিম, বরিশাল

দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার বাতিঘর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক - কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অশান্ত হয়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। যার ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। সেশন জটের আগুনে পুড়ছে হাজারো শিক্ষার্থী।
তবে নতুন উপাচার্য নিয়োগ হওয়ায় কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিগত ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বরিশাল বিভাগে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।দেশের ৩৩তম এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স প্রায় ১৫ বছর।এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাতজন উপাচার্য (ভিসি) দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে চারজনকেই নানা কারণে অপসারণ করা হয়েছে। বাকি তিনজনও তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বিদায় নিয়েছেন। ফলে উন্নয়ন আর গবেষণায় রয়েছে পিছিয়ে।এখনো মর্যাদার আসনে আসীন হতে পারেনি এ বিশ্ববিদ্যালয়টি।
শুরু থেকেই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলায় অস্থিরতা লেগেই আছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। নতুন নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য ড. মামুন অর রশিদ যোগদানের আগেই তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক সবার মনে প্রশ্ন, ববির এই অবস্থা কেন? নতুন উপাচার্য কি পারবেন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে?
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের তথ্যমতে, ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির শুরু থেকে চলতি বছর পর্যন্ত এখানে সাতজন উপাচার্য এসেছেন। তাঁরা হলেন অধ্যাপক ড. হারুনর রশীদ (প্রথম উপাচার্য), অধ্যাপক ড. এস এম ইমামুল হক (দ্বিতীয় উপাচার্য), অধ্যাপক ড. ছাদেকুল আরেফিন মাতিন (তৃতীয় উপাচার্য), অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া (চতুর্থ উপাচার্য), অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন (পঞ্চম উপাচার্য), অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম (ষষ্ঠ উপাচার্য) এবং অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ (নবনিযুক্ত ও সপ্তম উপাচার্য)।
তাঁদের মধ্যে ইমামুল হক, বদরুজ্জামান ভূঁইয়া, শুচিতা শরমিন এবং তৌফিক আলম আন্দোলনের মুখে চার বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদ ছেড়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যরাও তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাত উপাচার্যের এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার পেছনে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়া, গবেষণায় অগ্রগতি না থাকা এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের চাহিদা মেটাতে না পারা অন্যতম কারণ। যদিও শিক্ষাবিদেরা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের যোগ্যতায় ঘাটতি এবং দলাদলিকে দায়ী করে বলছেন, মূলত শিক্ষকরা নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এই অবস্থাকে উসকে দিয়েছেন।
গত শুক্রবার বিকেলে ক্যাম্পাসে যান নবনিযুক্ত উপাচার্য ড. মামুন অর রশিদ। এ সময় তাঁকে স্বাগত জানান শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এদিন সকালে একটি পক্ষ বাদ জুমা নতুন উপাচার্যের অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভের ডাক দেয়। এরপর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে পাল্টা স্বাগত মিছিলের ঘোষণা দিলে দুই পক্ষ ক্যাম্পাসে জড়ো হয়। তবে কোনো পক্ষই সুবিধা করতে পারেনি। ফলে জুমার নামাজের পর ক্যাম্পাসে চাপা উত্তেজনা দেখা দেয়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শান্ত ইসলাম আরিফ বলেন, একটি পক্ষ নতুন উপাচার্যকে বিতর্কিত করতে তাঁর অপসারণের দাবি তুলেছিল। কিন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা জুমার নামাজের পর পাল্টা স্বাগত মিছিল করলে ‘ঐ পক্ষটি’ ক্যাম্পাসে নামতেই পারেনি। তিনি বলেন, বিগত ছয়জন উপাচার্য কোনো কাজ করতে পারেননি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, নতুন উপাচার্য সেই সংকট কাটিয়ে তুলবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. হাফিজ আশরাফুল হক আজকের দৈনিককে বলেন, সাধারণ শিক্ষকেরা নতুন উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের শাটডাউন কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। তিনি বলেন, আমরা চাই নিজস্ব আইনে ববি চলবে। তাহলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
ড. হাফিজ আশরাফুল হক আরো বলেন, উন্নয়ন সময়সাপেক্ষ। ববিতে যে ফিজিবিলিটি স্টাডিজ (সম্ভাব্যতা যাচাই) শুরু হয়েছে, তার ভিত্তিতে অবকাঠামো উন্নয়ন হতে ৫-৭ বছর লাগবে। তা ছাড়া ববিকে এগিয়ে নিতে হলে গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, ‘শুনেছেন, ছাত্রদের একটি অংশ নতুন উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন?’
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. মুহসিন উদ্দীন বলেন, ‘ববির দ্বিতীয় ফেজের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আইনি কাঠামো অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হলে সংকট থাকবে না। নতুন ডিসিকে এ বিষয়গুলো ত্বরান্বিত করতে হবে।’ তিনি মনে করেন, সবারই উচিত নতুন উপাচার্যকে স্বাগত জানানো। বিরোধিতা না করে তাঁকে সময় দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বরিশাল সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান খান আজকের দৈনিককে বলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাক্ষেত্রে তলানিতে পৌঁছেছে। এর দিকে নজর দেওয়া দরকার। এ জন্য সবাইকে নিয়ে সংলাপ করতে হবে।
বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের বরিশাল জেলা সভাপতি অধ্যাপক কাজী জাবের আহমেদ আজকের দৈনিককে বলেন, ‘বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের উচ্চশিক্ষা প্রসারের বড় স্বপ্ন। কিন্ত কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা দলাদলির নামে গায়ের জোরে যা ইচ্ছে তা করেন।
তাঁরা এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেন। যে উপাচার্যই আসেন, তাঁকে ঘিরে একটি বলয় সৃষ্টি হয় এবং নানা অনিয়ম হয়। সরকারকে এ ধরনের প্রবণতা শক্ত হাতে দমন করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
আ.দৈ/আরএস/ইজা




















