প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো অন্তর হাজংয়ের গল্প...
আনিসুর রহমান,ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ)

মানুষ মানুষের জন্য,চিরন্তন সত্য হলেও কিন্তু এর মর্মবাণী ধারণ করেন খুব কম সংখ্যক মানুষই। মানবিক মানুষের কার্যক্রমে এগিয়ে যেতে পারে সমাজ, গ্রাম কিংবা অঞ্চল। কিন্তু মানুষের কর্মব্যস্ততা, অর্থের প্রতি অতিরিক্ত লৌহ মনোভাব মানবিক কর্মকান্ড থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
তারপরও সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদেরই একজন এমবিএ পাস করা যুবক অন্তর হাজং।মানবিক অন্তর হাজং এর বাড়ি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের খুজিগড়া গ্রামে। তিন ভাই এক বোনসহ ৬ সদস্যের পরিবারে অন্তর হাজং সবার ছোট। তার বাবা একজন দিনমজুর।
বসত ভিটা ছাড়া নেই কোন জমিজমা। পরিবারের অন্য সদস্যরা স্কুলে ভর্তি হলেও আর্থিক সংকটে পড়াশোনা করতে পারেনি।ফলে সবাই এখন দিনমজুর। তবে অন্তর হাজং নিজের অধম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে দারিদ্রতার সাথে লড়াই ভর্তি হন স্কুলে।
দিনমজুর বাবার সহযোগিতায় কখনো অন্যের জমিতে কাজ করে এবং প্রাইভেট পড়িয়ে তিনি চালিয়ে যান পড়াশোনা। দারিদ্রতার কষাঘাতে বেড়ে উঠা অন্তর হাজং নিজর কষ্টের উপলব্ধি থেকেই স্কুলের দারিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বই এবং শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেন। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফেরান।

ছবিতে- দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরন বিতরণের আগে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে সমাজ সেবক অন্তর হাজং
স্থানীয়রা জানায়, অন্তর হাজং দীর্ঘদিন ধরে গরীব অসহায় মানুষের কল্যানে কাজ করে যাচ্ছেন। গ্রামের অসহায়, দুঃস্থ মানুষ ও অসুস্থ রোগী আর্থিক সমস্যায় পরলে ছুটে যান তিনি। সাধ্যমত বাড়িয়ে দেন সহযোগীতার হাত। ২০১৪ সাল থেকে দারিদ্র্য শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণের মাধ্যমে শুরু হয় মানবিক কার্যক্রম।
এরপর একটি সেচ্চাসেবী সংগঠনে কাজ করে উপার্জিত অর্থ থেকে একের পর এক মানবিক কাজ করে আসছেন। যার মধ্যে দুর্গাপুর, ধোবাউড়া উপজেলায় গরীব শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে শিক্ষা সহায়তা, ফরম পূরণ, বস্ত্র বিতরণ, মাদক বিরোধী কর্মশালা, বাল্য বিবাহ বন্ধে সচেতনতা, নারী উন্নয়ন সেমিনার, মহামারী করোনা কালে গৃহবন্ধী মানুষের খাদ্য সহায়তা, যুব সমাজকে মোবাইল আসক্তি থেকে নিরুৎসাহিত করতে পাঠাগার স্থাপন ইত্যাদি।
এছাড়াও বিভিন্ন সময় ভারতীয় বন্য হাতির তান্ডব ক্ষতিগ্রস্থদের পাশে দাড়ান অন্তর হাজং। হাড়কাঁপানো শীতে জবুথুবু অবস্থায় সাইকেলে ঘুরে ঘুরে শীতার্তদের দুয়ারে পৌঁছে দেন শীতবস্ত্র। তিনি তার নিজের হাজং সম্প্রদায়ের ভাষাকে ঠিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করে আসছেন। হাজং সম্প্রদায় বাংলাদেশে একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী।
যাদের সংখ্যা খুবই অল্প। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর পাহাড়ি এলাকায়সহ সমতল ভূমিতে তাদের বাস করে তারা। কিছু সংখ্যক সিলেট ও সুনামগঞ্জেও বসবাস করেন। এই নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালা নেই, মৌখিক ভাষা আছে, যা বিলুপ্তির পথে। অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর চেয়ে হাজংরা শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পিছিয়ে রয়েছেন।
পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর ভাষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ১০ বছর ধরে নিরলস ভাবে কাজ করছেন অন্তর হাজং। ইতোমধ্যে তিনি বিভিন্ন জায়গায় নিজ উদ্যোগে ১০টি ভাষা সাহিত্য চর্চা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন।
এসব সামাজিক ও মানবিক কাজের জন্য প্রশংসিত হয়েছে এলাকাবাসীদের কাছে। স্থানীয়রা জানান, অন্তর হাজং এর মানবিক কর্মকান্ডে উৎসাহিত হয়ে অন্যরা এগিয়ে আসবে। মানবিক কার্যক্রমের বিষয়ে অন্তর হাজং বলেন, মানবসেবার মাধ্যমে আমি আত্মতৃপ্তি পাই। যার জন্য আমার উপার্জিত কিছু অর্থ এবং পরিচিত মানুষের সহায়তায় সীমিত আকারে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আর বড় পরিসরে কাজ করতে পারতাম।
আ.দৈ/আরএস/ জাকির




















