মানিকগঞ্জে সাড়ে তিন মাসে ১০ হত্যাসহ ৫৭ জনের মৃত্যু
সাজিদুর রাসেল , মানিকগঞ্জ

মানিকগঞ্জ জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে গত সাড়ে তিন মাসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দশ খুনসহ ৫৭ টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একের পর এক নৃশংসতা জেলায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই ধরণে হত্যা ও আত্মহত্যার জন্য সামাজিক অবক্ষয়কেই দায়ী করছেন সুশীল সমাজ।
জানা গেছে, মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে আশংকাজনক ভাবে হত্যা,গণপিটুনি ও আত্মহত্যার মতো সহিংস ঘটনা ঘটেই চলছে। একের পর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও লাশের সংবাদে আতংকিত হয়ে পড়েছে জেলাবাসী। গত সাড়ে তিন মাসে ১০ হত্যাকান্ডসহ ৫৭ টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু এপ্রিল মাসেই উদ্ধার হয়েছে ৯টি মরদেহ। সিংগাইরের জয়মন্টব এলাকায় গরু চোর সন্দেহে গনপিটুনিতে ১৮ জানুয়ারি দশানী গ্রামের তোতা মিয়ার ছেলে মজনু (২৭) এবং ছয়আনি গ্রামের বান্ধু মিয়ার ছেলে দীন ইসলাম (২২) নিহত হয়। মানিকগঞ্জ সদরের নতুন বসতি এলাকায় সম্পত্তি নিয়ে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ভাইদের মধ্যে দন্দ হয়।
গত ২৭ মার্চ বজলুর রহমান খান রাবিলকে ডেকে নিয়ে যায় আপন ভাই ও ভাতিজা। অতপর তাকে সকলে মিলে এলোপাতাড়ি আঘাত করে এবং পরে বজলুর রহমান খানের মৃত্যু হয়। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘুলিয়া এলাকা নদীপাড়ের ভুট্টা ক্ষেতের ভিতর থেকে ২৯ মার্চ ইজিবাইকচালক রফিক মিয়ার (২৭) মাথা বিহীন মরদে উদ্ধার করা হয়। শুক্রবার ( ৩ এপ্রিল) শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নে সন্ধার দিকে যমুনা নদীর আলোকদিয়া চরে বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মিরাজ নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে দূর্বৃত্তরা, এই ঘটনায় আরো একজন গুরুত্ব আহত হয়।
সদর উপজেলার বেতিলা-মিতরা ইউনিয়নের বার্থা এলাকা থেকে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) অজ্ঞাত ৪০/৪৫ ব্যক্তির রক্তাক্ত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৪ এপ্রিল সদর উপজেলার বনপারিল এলাকায় স্বর্ণের কানের দুলকে কেন্দ্র করে আতিকা আক্তার(৭) নামের এক শিশুকে হত্যা করে নাঈম নামের এক কিশোর। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতা গণপিটুনিতে অভিযুক্ত নাঈমের বাবা পান্নু মিয়া (৪৫) ও চাচা ফজলু মিয়া নিহত হন।
গ্রাম্য সালিশে শারীরিক ও মানসিক অপমান করায় ১৮ এপ্রিল নাজমা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলাও হয়েছে। গত ২৪ এপ্রিল সিংগাইর উপজেলার পৈত্রিক জমি নিয়ে গ্রাম্য সালিশি চলমজন অবস্থায় ছোট ভাই ওয়াহিদ খন্দকারের আক্রমণে বড় ভাই নজরুল খন্দকার (৬০) নিহত হন। পারিবারিক কলহ,মাদক,ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার,জমিসংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন ধরণের সহিংস ঘটনা দিনদিন বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুশীল সমাজ।
মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী বজলুর রশীদ বলেন,রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাব বিস্তারে যোগ্য মানুষদেরকে এগিয়ে আসতে দেওয়া হয় না। প্রশাসনের শৈথিল্য এই অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ। সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদ হাসান বলেন, সার্টিফিকেটের জন্য শিক্ষা নয়, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাবেই কারণে সমাজে বড় বড় দূর্ঘটনা ঘটছে। সে জন্য শিক্ষার মূল আদর্শ ও চেতনাকে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে পারি, তাহলে সামাজিক অনাচার ও অবিচার অনেকাংশে দূর করা সম্ভব।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন ) মানিকগঞ্জের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি আজকের দৈনিককে বলেন, জেলাতে যত গুলো ঘটনা ঘটেছে কোনটাই রাজনৈতিক সহিংসতা নয় বরং এগুলো সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আইন প্রয়োগে সমাধান সম্ভব না, সে জন্য পরিবার ও সমাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।
মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম আজকের দৈনিককে জানান, অধিকাংশ ঘটনাই পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের জের ধরে ঘটছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিরোধ মূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসব ঘটনা রোধে শুধু পুলিশ নয়, সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আ. দৈ./কাশেম/ জাকির




















