স্ট্রোকে এক কৃষকের মৃত্যু, হাসপাতালে আরো ২
নাসিরনগর আরো ৩ হাজার বিঘা জমির ধান পানির নিচে
আশিক চৌধুরী,নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) :

'মায়া লাগে, তাই জমিতে আসি'-চোখের সামনে পাকা ধান ডুবতে দেখি। কথাগুলো বলতেই কণ্ঠটা কেঁপে ওঠে মো. নজরুল ইসলামের। পুটিয়া বিলের পাঁচ বিঘা জমিতে স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ, ধারদেনা, এনজিও থেকে ঋণ—সব মিলিয়ে একটাই আশা ছিল, পাকা ধান ঘরে তুলবেন।পরিবারের সারা বছরের খরচ ও এনজিওর কিস্তি পরিশোধ করবেন। কিন্তু সেই ধানই যখন চোখের সামনে পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে, তখন আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। জমির আইলেই হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। পাশে থাকা কৃষকেরা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে প্রাণে বাঁচেন।এই দৃশ্য শুধু নজরুলের নয়, নাসিরনগরের অসংখ্য কৃষকের আজকের বাস্তবতা।
নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের এই ঘটনার মতোই আরও শত শত কৃষক পাকা ধান হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কারও চোখে জল, কারও কণ্ঠে হতাশা, আবার কারও শরীরই আর এই ধাক্কা নিতে পারছে না। তলিয়ে যাওয়া জমি দেখে অসুস্থ হয়ে আরও দুজন কৃষক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে একই ইউনিয়নের গোয়ালনগর রামপুর গ্রামে। নিজের ছয় বিঘা জমির পাকা ধান পানির নিচে ডুবে যেতে দেখে জমির আইলেই স্ট্রোক করে আহাদ মিয়া (৫৫) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তিনি গোয়ালনগর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের হরমুজ আলীর ছেলে।
জানা গেছে , সকালে শ্রমিক নিয়ে জমি কাটতে গিয়ে স্ট্রোকে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। সকালে শ্রমিক নিয়ে ধান কাটতে গিয়ে নিজের জমির পাকা ধানের তলিয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখে এই মর্মান্তিক পরিণতি। তিন সন্তানের জনক আহাদ মিয়া ধারদেনা করে ছয় বিঘা জমি আবাদ করেছিলেন। ওই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আহামেদ আলী। তিনি জানান, 'চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যেতে দেখে মানুষটা সহ্য করতে পারেনি।'
আজ শনিবার (২ মে) সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, গোয়ালনগর ইউনিয়নের সোনাতলা, ঝামারবালি ও কদমতলি— এই তিন গ্রাম মিলিয়ে অন্তত তিন হাজার বিঘা জমি নতুন করে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে শুধু সোনাতলা গ্রামেই দেড় থেকে দুই হাজার বিঘা জমি ডুবে গেছে। ঝামারবালি ও কদমতলিতেও বিস্তীর্ণ জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সোনাতলা গ্রামের কৃষক খলিল মিয়া বলেন, '১০ বিঘা জমি করছিলাম ঋণ নিয়ে। এখন ৮ বিঘাই পানির নিচে। এই অবস্থায় পরিবার নিয়ে এলাকায় থাকা কঠিন হয়ে যাবে।'
ঝামারবালি গ্রামের কৃষক শাহাজান মিয়ার কন্ঠেও আক্ষেপের কথা। ক্তিনি বলেন, 'নির্বাচন আসলে সবাই আসে, কিন্তু এখন কেউ নেই। কৃষি অফিস থেকে প্রণোদনার তালিকা হলেও আমাদের এলাকার হাজার হাজার কৃষক বঞ্চিত।
কৃষক রহমত আলী বলেন, তিন বিঘা জমি কেটে আনছি ৪দিন হয়ছে। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে সব ধান পচে গন্ধ বের হচ্ছে। বাকি চার বিঘ জমি পানির নিচে আছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান সাকিল জানান, 'দুই দিন আগেও প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি তলিয়ে গিয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে আরও দুই থেকে তিন হাজার বিঘা জমি নতুন করে তলিয়েছে বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন। একজন কৃষকের মৃত্যুর খবর শুনে ঘটনাস্থলে আমাদের এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে নিহতের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনা নাছরিন আজকের দৈনিককে বলেন, 'একজন কৃষকের মৃত্যুর খবর পেয়েছি, আরো কয়েকজন স্ট্রোক করে চিকিৎসাধীন আছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কৃষি কর্মকর্তাকে সরেজমিন ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে প্রকৃত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।'
আ. দৈ./কাশেম/ জাকির




















