অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন
যাত্রাবাড়ীতে এপিসি থেকে গুলি চালায়, চা দোকান থেকে ধরে তাইমকে হত্যা
নিজস্ব প্রতিবেদক

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই আর্মার্ড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি) থেকে বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছিল পুলিশ। এসময় কাজলার একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নেওয়া ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়াকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
আজ সোমবার (১২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও ফারুক আহাম্মদ। এসময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে দেশজুড়ে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে তাইম হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে আদালতে হত্যার ভিডিও এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশের এক কর্মকর্তার কথোপকথনের ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।
প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি তুলে ধরে প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। এসময় এপিসি থেকে পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি চালাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতি দেখে তাইম ও তার বন্ধুরা যাত্রাবাড়ীর পূর্বদিকে কাজলার একটি চায়ের দোকানে যান।
কিছুক্ষণ পর দোকানটির কাছে ২৫ থেকে ৩০ জন পুলিশ সদস্য জড়ো হন। তাদের দেখে তাইম ও তার বন্ধুরা দোকানের শাটার নামিয়ে দেন। এসময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য ‘এদের ক্রসফায়ার করে দিই’ বলে মন্তব্য করেন। এছাড়া পুলিশ শাটার খুলতে বললেও তারা তা খোলেননি। পরে পুলিশ শাটার খুলে তাইমকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর এক পুলিশ সদস্য তার বাঁ পায়ে ও কোমরের কাছে গুলি করেন বলে সাক্ষীর জবানবন্দির বরাতে জানায় প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউশনের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ওই সময় পুলিশ দোকান থেকে বিভিন্ন মালামাল লুট করে। লুট হওয়া মালামালের মধ্যে ২৫ হাজার টাকার সিগারেটও ছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
তাইমকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তার বন্ধু ও মামলার সাক্ষী শাহরিয়ার। তবে পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিতে দেয়নি বলে সাক্ষীর জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। শাহরিয়ারকে পুলিশ বলেছিল, ‘মরবি, নাকি যাবি? পেছনে তাকাবি না, দৌড় দে।’
যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশন জানায়, তাইম হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও উপ-পরিদর্শক (এসআই-নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামানের বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে দুজনের ভিডিও এবং একজনের স্থিরচিত্র আদালতে প্রদর্শন করা হয়। প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিডিওতে তাদের গুলি চালাতে দেখা যায়। পালানোর চেষ্টা করা এক আন্দোলনকারীকেও গুলি করা হয়েছিল বলে যুক্তিতর্কে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে রাহাত, লিটন ও শাহরিয়ারের সাক্ষ্য তুলে ধরে প্রসিকিউশন জানায়, তিনজনের বর্ণনায় সামঞ্জস্য রয়েছে। তাদের জবানবন্দির বরাতে আরও বলা হয়, ২০ জুলাই জাকির হোসেন ১৯৬ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিলেন এবং ওহিদুল হক মামুন তার পিস্তল থেকে দুই রাউন্ড গুলি করেছিলেন।
যুক্তিতর্কের সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার (ডিসি) ইকবাল হোসাইনের কথোপকথনের একটি ভিডিও আদালতে প্রদর্শন করা হয়।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ভিডিওতে ইকবাল হোসাইনকে বলতে শোনা যায়, ‘একটা গুলি করি, একটাই যায়, বাকিডি যায় না, স্যার।’ এছাড়া তাইমকে গুলি করার ভিডিও এবং সাজ্জাদ উজ জামানের স্থিরচিত্রও আদালতে প্রদর্শন করা হয়।
তাইমের বাবা পুলিশের এসআই ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করে পুলিশ। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাইমের বন্ধু রাহাতকেও গুলি করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তাইম হত্যা মামলার ১১ আসামির মধ্যে দুজন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান এবং সাবেক এসআই শাহদাত আলী।
অন্য নয় আসামি পলাতক। তারা হলেন; ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী জোনের সাবেক উপ-কমিশনার (ডিসি) ইকবাল হোসাইন, অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও উপ-পরিদর্শক (এসআই-নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান। এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি এই ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে মামলাটিতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে।
আ. দৈ./একে




















