সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬,
২০ আশ্বিন ১৪৩৩
ই-পেপার

সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
৭৫ মিনিটে তিন ভূমিকম্প, বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
শাহীন রহমান
প্রকাশ: রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩৫ পিএম   (ভিজিট : ১৬)
X

মাত্র ৭৫ মিনিটের ব্যবধানে পরপর তিনটি ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ১২ মিনিট থেকে রাত ১টা ২৭ মিনিটের মধ্যে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় এসব ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় কম্পন অনুভূত হওয়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখন পর্যন্ত এসব ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। 

ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূকম্প বিজ্ঞান কেন্দ্রের (ইএমএসসি) তথ্য অনুযায়ী, রাত ১২টা ১২ মিনিটে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৯। এর মাত্র এক মিনিট পর ভারতের মিজোরামের লুংলেই এলাকায় ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। পরে রাত ১টা ২৭ মিনিটে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা এলাকায় ৩ দশমিক ৮ মাত্রার তৃতীয় ভূমিকম্পটি হয়। এসব কম্পন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়। 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ের আশপাশে মিয়ানমারের ম্রাক-ইউ এলাকায় ৪ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও নথিবদ্ধ হয়েছে। রোববার সকালেও ত্রিপুরা সীমান্ত এলাকায় ৩ দশমিক ৮ মাত্রার একটি মৃদু ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের আশপাশের ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে একাধিক কম্পন নথিভুক্ত হয়েছে।  পরপর ভূমিকম্পের ঘটনায় আতঙ্ক তৈরি হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়া মানেই বড় ভূমিকম্প আসন্ন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে বাংলাদেশ যে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো সেই বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে।

তারা বলছেন ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত দেশ বলা যায় না। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চল ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমানের মতে, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প মোকাবিলায় তাই সমন্বিত প্রস্তুতির প্রয়োজন।  ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক ঝুঁকির পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে নগরায়ণের ধরন এবং ভবনের দুর্বলতা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বিপুলসংখ্যক ভবন, ঘনবসতি, সরু সড়ক ও অপরিকল্পিত নগর কাঠামো বড় ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলতে পারে।

ঢাকার ৫৫-৬০ শতাংশ এলাকা ঝুঁকিতে

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ঢাকার মাত্র প্রায় ৩৫ শতাংশ এলাকা শক্ত প্লাইস্টোসিন মাটির ওপর অবস্থিত। বাকি বড় অংশ জলাভূমি, প্লাবনভূমি, পুরোনো নদীখাত ও নিচু অববাহিকা নিয়ে গঠিত। ভূমিকম্পের সময় মাটির ধরনও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রায় প্রভাব ফেলে। নরম ও ভরাট মাটিতে কম্পনের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি অনুভূত হতে পারে। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্পেও বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এক রকম নাও হতে পারে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো ভবনের নিরাপত্তা। রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ২১ লাখের বেশি ভবন ও স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৩ হাজার ২৫২টি ভবনে সমীক্ষা চালানো হয়েছে। ওই সমীক্ষায় ৪২টি ভবনকে ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ভবন অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজউক এখন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তার আওতাধীন এলাকার সব ভবন পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা এবং ভূমিকম্প সহনশীলতা যাচাই করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বড় ভূমিকম্প হলে শুধু ভবনধস নয়, গ্যাসলাইন থেকে অগ্নিকাণ্ড, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এবং যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো একাধিক সংকট একসঙ্গে তৈরি হতে পারে। অধ্যাপক জিল্লুর রহমানের মতে, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সরু সড়ক, যানজট, অবৈধ পার্কিং ও ভবনের ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারী যানবাহন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের স্থিতিশীলতা যাচাই না করে উদ্ধারকর্মীরা প্রবেশ করলেও তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।  এ কারণে বড় ভূমিকম্পের পর দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন, ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষ শনাক্তকরণ, অগ্রাধিকারভিত্তিতে উদ্ধার এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সও প্রস্তুতি জোরদার করছে। বড় ভূমিকম্পে কোনো ফায়ার স্টেশন বা সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যাতে উদ্ধারকাজ বন্ধ না হয়, সে জন্য জনবল, সরঞ্জাম ও কমান্ড কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ঢাকা ও আশপাশের ৪১টি পয়েন্টে উদ্ধার সরঞ্জাম ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পূর্বাচলে বিশেষ রেসকিউ টিম মোতায়েনের পাশাপাশি বিভাগীয় শহরগুলোতে পৃথক উদ্ধারকারী দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকার আশপাশের ১০০টি ফায়ার স্টেশনকেও জরুরি প্রয়োজনে রাজধানীকে সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বড় ভূমিকম্পে মোবাইল টাওয়ার ও ওয়্যারলেস যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে দেশব্যাপী মহড়াও করেছে ফায়ার সার্ভিস।

পরপর তিনটি ভূমিকম্প মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করলেও বিজ্ঞানীরা এখনই এটিকে বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না। তবে ভূমিকম্পের সময় নির্দিষ্ট করে আগে থেকে পূর্বাভাস দেওয়ার সুযোগ না থাকায় ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতির বিকল্প নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কতটা হবে, তা শুধু ভূমিকম্পের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে না। ভবনের নির্মাণমান, মাটির ধরন, নগর পরিকল্পনা, উদ্ধারব্যবস্থা এবং দুর্যোগের মুহূর্তে মানুষের প্রস্তুতিও বড় ভূমিকা রাখবে। সাম্প্রতিক কম্পন তাই আতঙ্কের চেয়ে সতর্ক হওয়ার বার্তাই বেশি দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত ও অপসারণ, ভূমিকম্প সহনশীল নির্মাণ নিশ্চিত করা, নিয়মিত মহড়া, উদ্ধার সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত জনবল বাড়ানো এবং জরুরি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাই পারে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে।



আ.দৈ/এসআর









Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝