জালিয়াতি ও অর্থ সাত্মসাতের শোকজ নিয়ে চলছে লুকোচুরি
ডিএনসিসিতে দুর্নীতিবাজ কর কর্মকর্তা মাইদুলকে রক্ষায় ব্যস্ত সচিবের দপ্তর
আবুল কাশেম:

ছবিতে- এই দুই বহুতল ভবনের হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণে ব্যাংকের ভুয়া কাগজে ঋণ সুবিধা দিয়েছে
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চলঃ ১০ এর কর কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত মোঃ মাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়াবহ রেকর্ড জালিয়াতি, সরকারি ও সিটি করপোরেশনের আইন লঙ্ঘন এবং ব্যাংক ঋণের ভুয়া ডকুমেন্ট তৈরির মাধ্যমে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে অবৈধভাবে বড় বড় ভবনের হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণের চাঞ্চল্যকর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএনসিসির সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা ‘আজকের দৈনিক পত্রিকাকে’ বলেন, অঞ্চলঃ ১০এর কর কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম পুরো অফিসকে দুর্নীতির আখঁড়ায় পরিনত করেছেন। চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ মাইদুল ইসলাম বর্তমানে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ডিএনসিসির প্রশাসকের দপ্তর এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - সচিবের দপ্তরের অত্যন্ত ঘনিষ্ট জন হয়ে উঠেছেন। যারফলে রাজস্ব বিভাগের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা তার অপকর্মের লাগাম টানতে অনেকটাই অপারগ।
শুধু তাই নয়, মাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ডিএনসিসিতে বিভিন্ন এলাকায় বাসা-বাড়ি, বড় বড় ভবনের হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ও আদায় সংক্রান্ত বিষয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার , নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও লাখ লাখ টাকা অত্মসাতের সুনিদিষ্ট অভিযোগ ধামা চাপা পড়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনি চাকরির সুবাধে অবৈধভাবে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সহাস কেউ পাচ্ছেন না। দ্রুত তাকে উপকর কর্মকর্তার দায়িত্বে ফিরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অন্যত্রে সরিয়ে নেওয়া হলে অঞ্চল-১০ এর ভবন মালিকরা হয়রানী থেকে পরিত্রাণ পেতে পেতে পারেন।
কারণ এখনো মাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় নানা প্রশ্ন উঠেছে সচিব এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দাপ্তরিক কার্যক্রম নিয়ে। তার বিরুদ্ধে সুনিদিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও কেনো প্রশাসন এখনো আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। দুর্নীতিগ্রস্ত উপকর কর্মকর্তাকে দায়িত্বের অতিরিক্ত একটি অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে ‘কর কর্মকর্তার’ দায়িত্ব দেওয়ার পরই তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
ডিএনসিসিতে রাজস্ব বিভাগে মাইদুল ইসলামের মতো এতো প্রভাবশালী দ্বিতীয় কোন কর্মকর্তা নেই বললেই চলে। প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরের দুই একজন পদস্থ কর্মকর্তারা আশ্বিবাদে আজ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দপ্তরের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার সাহস পেয়েছেন মাইদুল ইসলাম।
তারা আরো জানান, গত ২০ জানুয়ারি থেকে ডিএনসিসির অঞ্চলঃ ১০এর কর কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণের পরই বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। ইতোমধ্যে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, ভয়াবহ জালিয়াতি ও ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে দ্রুত কোটিপতি হয়েছে।
মোঃ মাইদুল ইসলাম সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ২০২১ সালে তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলামের আমলে ডিএনসিসিতে রাজস্ব বিভাগে উপকর কর্মকর্তা পদে চাকরিতে নিয়োগ পায়। চাকরিতে যোগদান করেই মাইদুল ইসলাম দ্রুত মেয়রের দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। ফলে রাজস্ব বিভাগের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে তিনি চাপে রাখতেন।
২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ও মেয়র আতিকুল ইসলামের পতনের পর একটু চাপে পড়েছিল দুর্নীতিবাজ উপ কর কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম। কিন্তু জাতীয়তাবাদী দুই একজন কর্মচারী নেতার উদারতা ও মানবিকতার সুযোগে পুনরায় বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি।
সূত্র মতে, চলতি বছর গত ৫ মে কর কর্মকর্তা মাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দপ্তরে সুনিদিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে ডিএনসিসির আওতাধীন সাতারকুল ও বাড্ডার কাছে বাড়ী নং ২০০৭ পূর্ব পদরদিয়া (পুকুর পাড়া) ওই বাড়ির মালিকের কাছে পাওনার পরিমান ছিল প্রায় ২৬ লাখ টাকা। পরে বাড়ির মালিক সুইডেন প্রবাসী মোঃ সিরাজুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করে ভূয়া ঋনের কাগজ তৈরি করে ওই মালিককে অবৈধভাবে ঋন সুবিধা দিয়েছেন মাইদুল ইসলাম।
প্রথমে ওই ভবনে প্রায় ২৬ লাখ টাকা ট্যাক্স নির্ধারণ করা হয় পরে ২১ লাখ ৭১ হাজার টাকা ট্যাক্স নিধারণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাড়ী নং ১২১ পূর্ব পদরদিয়া সাতার কুল- বাড্ডা ঢাকার মালিক নুর মোহাম্মদ সুমন গং এর হোল্ডিং ট্যাক্স পাওনার পরিমান ছিল প্রায় ১৬ লাখ টাকা। এখানেও ভুয়া ঋণ সুবিধা দিয়ে ডিএনসিসিকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছেন। পাওনা ট্যাক্স নির্ধরণ করা হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ ৭২, হাজার ৫১৫ টাকা ।
আরো অভিযোগ রয়েছে, তিনি ৪১ নং ওয়ার্ডের সব বাণিজ্যিক প্লট বা স্থাপনার ট্যাক্স নির্ধারন ছাড়াই ভুয়া পওনার নোটিশ দিয়ে মানুষকে হয়রানী করে মোটা অংকের টাকা আত্মসাৎ করে আসছে । যেমন বাড়ী নং- ২২ মেইন রোড, মগার দিয়া সাতারকুল বাড্ডা, ঢাকা, মালিক মোঃ রোকশেদ আলী গং পাওনা টাকার পরিমান ভুয়া কাগজ দিয়ে ৯ লাখ ১৪ হাজার ১১২- টাকা। উক্ত হোল্ডিং এর ২৪/২ ধারা চিঠি পাঠান। যদিও এই চিঠি লেখার কথা সংশ্লিষ্ট বিভাগের হিসাব সহকারীর। কিন্ত চিঠি লিখেছেন কর কর্মকর্তা মো. মাইদুল ইসলাম নিজেই। যা সিটি কর্পোরেশনের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। অন্য একটি হোল্ডিং হলো, বাড়ী-১৬৫, সাতারকুল মেইন রোড, সাতারকুল, বাড্ডা, ঢাকা। মালিক মোঃ হোসেন আলী ভুয়া পাওনার পরিমান ১১ লাখ ১০ হাজার ২৮ টাকা ।
জরুরি ভিত্তিতে অভিযুক্ত কর কর্মকর্তা মাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে তাকে আইনের আওতায় আনা হলে ওই এলাকবসী হয়রানী থেকে রেহাই পারেন। একই সাথে রাজস্ব বিভাগে দুর্নীতি, লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা কমবে এবং ডিএনসিসির কোষাগারে রাজস্ব আদায় বাড়বে।
সর্বশেষ খবরে জানা যায়, ডিএনসিসিতে অঞ্চল -১০ এ, ভুয়া কাগজে হোল্ডিং ট্যাক্স কম নির্ধারণের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর কর্মকর্তা মাইদুল ইসলামকে প্রশাসকের নির্দেশ শোকজের বিষয়টি আলোচনা শুরু হয়েছে। শোকজের জবাব দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ খবরে জানা যায়, ডিএনসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাবীবুল আলম ‘আজকের দৈনিক পত্রিকার ’এই প্রতিনিধিকে জানান, জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া রকর্ডে অবৈধভাবে ঋন সুবিধা দেওয়ার বিষয় নিয়ে প্রশাসক স্যারের সাথে আলোচনা হয়। পরে যেসব ভবন মালিকদের অবৈধভাবে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, ওইসব নথি বাতিল করা হয়েছে। একই সাথে আইন ও বিধি মোতাবেক পুরো ট্যাক্স আদায় করতে বলা হয়েছে।
প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, ডিএনসিসির অভিযুক্ত কর কর্মকর্তা মো.মাইদুল ইসলামকে ওই অপরাধের জন্য শোকজ করার কথা সচিবের দপ্তর থেকে। জবাব ওই দপ্তরেই জমা হবার কথা।
এদিকে ডিএনসিসি সচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য জানার তার ‘ওয়াটঅ্যাপে ক্ষুধে বার্তা’ পাঠানো হয়। একই সাথে তার মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ক্ষুধে বার্তাটি হলো; ‘অঞ্চলঃ ১০ এর কর কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত মোঃ মাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভুয়া রের্কড তৈরি ও জালিয়াতির মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ এবং অর্থ আত্মসাতের অপরাধে কোন তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে কিনা, কিংবা তাকে শোকজ করা হয়েছে কিনা। এদিকে সিআরও সাহেব বলেছেন শোকজ করার কথা আপনার দপ্ত থেকে। অথচ মাইদুল ইসলাম বলছেন, শোকজের চিঠি পায়নি। এ বিষযে আপনার দপ্তরের সঠিক তথ্য জানা দরকার।’ তবে আজ রোববার (৪ অক্টোবর) পর্যন্ত ওই শোকজের জবাব সংক্রান্ত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
আ. দৈ./একে




















