কাজ পেয়েছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা দ্বীন ইসলামও
অস্তিত্বহীন কাজে পাবনায় সাড়ে ২৭ কোটি টাকা লুট!
বিশেষ প্রতিবেদক

যে ভবনের নির্মাণ কাজ এখনও মাঝ পথে সেই ভবনের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজের টেন্ডার করে কাজ ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া মূল টেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত কাজকে নতুন টেন্ডার করে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারার ঘটনা ঘটেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাবনা ডিভিশনে। এই কাজের মূল হোতা নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবির স্থানীয় প্রভাবশালী এমপি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করেই এই অর্থ হজম করেছে। যার সহযোগী ছিল বহু বিতর্কিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সাজিন কনস্ট্রাকশনের মালিক শাহাদাত হোসেন।
গণপূর্ত সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি বেসমেন্টসহ ১০ তলা ফাউন্ডেশনে ১০ তলা ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে। একই বছরের জুন মাসে সাজিন কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে এর কাজ সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। রূপপুর বালিশকান্ডের বিতর্কিত ঠিকাদার সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ২শ’ ৯৯ কোটি ৬৪ লাখ ৭২ হাজার টাকার কাজ পায়। বর্তমানে ভবনটির ৯ তলা ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর আভ্যন্তরীণ কোন কাজ সম্পন্ন হয়নি।
মূল ভবনের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ভবনের ‘অবশিষ্ট কাজ’ (রিমেইনিং ওয়ার্কস) হিসেবে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি তড়িঘড়ি করে ৬টি দরপত্র আহ্বান করা হয়। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সবগুলো দরপত্র ওপেন করা হয়। মূল ভবনের নির্মাণ কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কাজগুলোকেও এই দরপত্রে রাখা হয়।
পিপিআর ২০২৫-এর ১৭ বিধি অনুযায়ী কোন প্রকল্পের কাজ সর্বোচ্চ পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা যাবে। এই দরপত্রের মধ্য দিয়ে এই প্রকল্পে কাজের সংখ্যা দাড়ায় ৭টি। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম টেন্ডারটি যেখান থেকে অনুমোদন হয়েছে পরবর্তী টেন্ডারগুলোও সেখান থেকে অনুমোদন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া বিভাজন দেখিয়ে টেন্ডার করা হয়। যার অনুমোদন করেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাউদুদুর রহমান। যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের প্রথম টেন্ডারটি অনুমোদন দিয়েছে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী টেন্ডারগুলোও অনুমোদনের জন্যও ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে যেতে হবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পাবনা গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাউদুদুর রহমান ও পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ কবির পারস্পরিক যোগসাজসে এই টেন্ডারগুলোর প্রাক্কলন ও টেন্ডার অনুমোদন করেন। প্রতিটি টেন্ডার রাখা হয়েছে ৫ কোটি টাকার নিচে যাতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তার ক্ষমতার মধ্যে প্রাক্বলন ও টেন্ডারগুলো পাস করতে পারেন।
প্যাকেজ ভেঙ্গে টেন্ডার করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘণ । এছাড়া কোন প্রকল্পের প্যাকেজ ভেঙ্গে আলাদা আলাদা টেন্ডার করতে হলে হেড অব প্রকিউরমেন্ট এনটিটি’র অনুমোদন নিতে হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ‘হেড প্রকিউরমেন্ট এনটিটি’ বা হোপ হলো প্রধান প্রকৌশলী। তাঁর অনুমোদন ছাড়াই প্যাকেজ ভেঙ্গে টেন্ডার আহ্বানের মধ্য দিয়ে তারা উভয়েই পিপিআর লঙ্ঘণ করেছেন।
একটি নির্মাণাধীন ভবনের ‘অবশিষ্ট কাজে’র নামে এই দুই প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা মিলে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। এই লুটপাটে ব্যবহার করা হয়েছে বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে সুবিধাভোগী বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। রূপপুর বালিশকান্ডে বিতর্কিত সাজিন কনস্ট্র্যাকশনের মালিক শাহাদাত হোসেন বিভিন্ন লাইসেন্স ব্যবহার করে এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন এবং বিল তুলে নেন।
পাবনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর আহ্বানকৃত টেন্ডার আইডি নং ১২১৭৬৫০ নম্বর টেন্ডারে হাসপাতাল ভবনের ‘এ’ ব্লকের সংলগ্ন খোলা ছাদে কাঁচের কাজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। যার কাজ পেয়েছে টুঙ্গীপাড়ার বাসিন্দা যুবলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগ আমলে নগর গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক দ্বীন ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসএ এন্টারপ্রাইজ। ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকার এই কাজের বিল ইতিমধ্যেই পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ এ কাজের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই। দ্বীন ইসলাম নিজেও স্বীকার করেছেন, তিনি শাহাদাতকে তাঁর লাইসেন্স ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের অবস্থা কী তা তিনি জানেন না।
আইডি নং-১২১৭৬১২ নম্বর টেন্ডারে হাসপাতাল ভবন নির্মাণের জন্য ম্যাট ও মটর-আকৃতির নুড়ি পাথর দিয়ে অতিরিক্ত আরসিসি কাজ এবং ভিত্তি ইটের দেয়াল নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ব্যায় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৯ হাজার ৭৯৪ টাকা । এই কাজটি পেয়েছে মোখছেদুল আলম নয়নের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশন। কাজ ছাড়াই ইতিমধ্যে এই কাজের বিল তুলে নেয়া হয়েছে। মেসার্স নূর কনস্ট্রাকশন ৪ কোটি ৯৮ লাখ ২০ হাজার ১৫৭ টাকার আরো একটি কাজ পেয়েছে। আইডি নং- ১২১৭৬২৭ নম্বর দরপত্রে হাসপাতাল ভবন নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ওভারহেড জলাধার নির্মাণ এবং শাটারিংয়ের অতিরিক্ত উচ্চতা ইত্যাদি কাজের কথা বলা হলেও এটাও মূল দরপত্রের অংশ। শুধুমাত্র দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই এর বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
আইডি নং ১২১৭৬১৬ নম্বর দরপত্রে হাসপাতাল ভবন নির্মাণের ল্যাবরেটরি, ওটি, আইসিইউ কক্ষে ভিনাইল ফ্লোরিং এবং বিভিন্ন কক্ষে ইপোক্সি পেইন্ট সরবরাহ ও স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৮ হাজার ৭৬২ টাকার কাজ পেয়েছেন মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের মালিকানাধীন বন্ধু কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটি ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৮৫ হাজার ৬৬২ টাকার আরেকটি কাজ পেয়েছে। আইডি নং ১২১৭৬২০ নম্বর দরপত্রে তারা হাসপাতাল ভবন নির্মাণের ১৫ ইঞ্চি এবং ১২ ইঞ্চি ইটের কাজ পেয়েছে। যা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের মূল দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়া আইডি নং ১২১৭৫৯৬ নম্বর দরপত্রে আরসিসি ওয়াল, মার্বেল স্টোন ফ্লোরিং ও ফেসিং স্ট্রিপ সহ মসজিদ সংলগ্ন স্ল্যাব, মসজিদ নির্মাণ, টিচিং মর্গ এবং মর্চুয়ারি বিল্ডিং, গেট হাউস এবং সিকিউরিটি পোস্ট, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং পাবলিক টয়লেট, পাম্প হাউস এবং জেনারেটর বিল্ডিংয়ের কথা বলা হলেও এটা মূল দরপত্রের অংশ। এতো বড় কাজের জন্য মাত্র ২ কোটি ৪৫ লাখ ৬২ হাজার ১৫১ টাকা ধরা হয়েছে। যা বাস্তবে কোনভাবেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এই কাজটি পেয়েছে পাবনার শালগরিয়ার মো. ইমামুর রহমানের মালিকানাধীন আই আর ইনফ্রাস্টাকচার। প্রতিষ্ঠানটি বিগত আওয়ামী লীগ সময়ের শেষ দিকে ২০২৩ সালের ২২ জুন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্তির অনুমতি পেয়েছে।
এই কাজগুলোর বেশিরভাগই মূল টেন্ডারের অংশ এবং কিছু কাজ ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর করার কথা। অথচ ‘অবশিষ্ট কাজ’ হিসেবে আহ্বানকৃত টেন্ডারের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন বিতর্কিত সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের কর্ণধার শাহাদাত হোসেন। সদ্য সমাপ্য অর্থ বছরে এর পুরো বিল প্রদান করা হয়েছে ‘নাম সর্বস্ব’ কাজের জন্য। যার বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই। এই চক্রের মূল হোতা শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে পাবনা গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তারা তাতে সাড়া দেননি। সাংবাদিক পরিচয় ও অনিয়মের অভিযোগ শুনেই তারা এড়িয়ে গেছেন বিষয়টি। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পপুলেশন প্রজেক্ট সেল-পিপিসি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী একেএম সোহরাওয়ার্দীও বিষয়টি জানেন না। তিনি জানান, বিষয়টি তাঁর নজরে নেই। তবে খোঁজ নিবেন।
পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডা. আমজাদুল হক বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি নিদৃষ্ট পাওয়ার অব ডেলিগেশনের মাধ্যমে কাজ করে। পিডি অফিস কোন কমিটি বা টেকের মেম্বার নয়। এ নিয়ে আগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তার প্রেক্ষিতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সেই কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। এই কাজ থেকে তিনিও সুবিধা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
আ.দৈ/আরএস




















