একদিনে কুমিল্লায় আটক: ৬২৪
অভিযানে থামবে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য!
শাহীন রহমান

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সন্তানের এমন নির্মম মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে নয়, কুমিল্লার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি করেছে গভীর উদ্বেগ। এর মধ্যেই জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে এক রাতে ৬২৪ জনকে আটকের ঘটনা কিশোর অপরাধের বিস্তার নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পুলিশ বলছে, আটক ৬২৪ জনকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা হয়নি। বিভিন্ন অপরাধে উঠতি বয়সী কিশোরদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ, তথ্য সংগ্রহ এবং অতীত অপরাধের রেকর্ড যাচাইয়ের জন্য এই অভিযান চালানো হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অপ্রতিম হত্যায় নতুন করে আলোচনায় গ্যাং
গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম ছিল কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে পুলিশ ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারদের মধ্যে ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ দুজন কিশোর রয়েছে। তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ঠিক কী উদ্দেশ্য ছিল এবং এর সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা কতটা—তা তদন্তের বিষয়। অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহল থেকে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটেই পুলিশের এই বড় অভিযানকে দেখা হচ্ছে।
বুধবার রাতে কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান শুরু করে জেলা পুলিশ। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও যেসব স্থানে কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের আড্ডা বা উৎপাতের অভিযোগ রয়েছে, সেসব জায়গাকে অভিযানের আওতায় আনা হয়। জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অভিযানে সরাসরি অংশ নেন। রাত দেড়টা পর্যন্ত মোট ৬২৪ জনকে আটক করার তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ৭৫ জন, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ৪৬, বুড়িচংয়ে ৫০, মনোহরগঞ্জে ৪১, দাউদকান্দিতে ৫৯ এবং লাকসামে ৩৫ জনকে আটক করা হয়। অন্য থানাগুলোর আটকদের তথ্যও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে একযোগে আটকের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—আটক ৬২৪ জনের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কতজন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত এবং কতজন শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে অভিযানের আওতায় এসেছে? পুলিশের বক্তব্য, যাচাই শেষে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
এদিকে অভিযানকে কেন্দ্র করে দাউদকান্দি থানায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়। সেখানে ৫৯ জনকে আটকের পর তাদের অভিভাবক ও স্বজনেরা থানায় জড়ো হন। একপর্যায়ে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। কয়েকজন আটক কিশোর থানার ভেতর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। পুলিশ বলছে, অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ের কারণে সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল এবং পরে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। থানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটকদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে লিখিত নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আর যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের তথ্য পাওয়া যাবে, তাদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কয়েক বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আলোচিত বিষয়। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সাল থেকে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে এবং ২০২২ সালের দিকে বিভিন্ন গ্যাংয়ের সংখ্যা ২০টিতে পৌঁছেছিল। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জেলার অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে পুলিশের কাছে এসব গ্যাংয়ের হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই।
স্থানীয়ভাবে কিং স্কোয়াড, স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে, ক্রাইম সেটআপসহ কয়েকটি গ্যাং বা চক্রের নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে এসব নামের সঙ্গে বর্তমানে কারা সক্রিয় এবং তাদের সদস্য সংখ্যা কত—এ বিষয়ে পুলিশের হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ্যে নেই। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড নিয়েও কয়েকটি প্রতিবেদনে কোটবাড়ী-সালমানপুর এলাকার কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্রের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে। আবার অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে তার পূর্বপরিচয়ের কথাও পুলিশ জানিয়েছে। ফলে হত্যার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিল কি না, তা তদন্তের ফলের ওপরই নির্ভর করছে।
এক রাতে ৬২৪ জনকে আটকের ঘটনা কুমিল্লায় কিশোর অপরাধের বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই অভিযান কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা এবং অপরাধে জড়িত কিশোরদের পুনরায় অপরাধে ফিরে যাওয়া ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তার ওপর। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযান একবারের জন্য নয়; কিশোররা যাতে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারে এবং বখাটেদের উৎপাত নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে জন্য নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সুপার অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে উঠে এসেছে কিশোরদের অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়া, গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার, মাদক ও অপরাধপ্রবণ পরিবেশ এবং পরিবার-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ের প্রশ্ন। ৬২৪ জনকে আটকের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে—তদন্তে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা, নিরপরাধদের হয়রানি থেকে বাদ দেওয়া এবং কুমিল্লায় কিশোর অপরাধের যে নেটওয়ার্ক নিয়ে এতদিন অভিযোগ ছিল, সেটি বাস্তবে কতটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
আ.দৈ/এসআর




















