কারাগার নির্মাণ, লিফট স্থাপন ও টেন্ডার নিয়ে তদন্তের দাবি, বিপুল সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগের পর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়াজ তানভীর
বিশেষ প্রতিবেদক

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার কারসাজি, কমিশন আদায়, প্রকল্পে অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তাঁর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত ও লিখিত অভিযোগ করা হলেও সেগুলোর পরিণতি কী হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-এত অভিযোগের পরও কীভাবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল আছেন?
নিয়াজ মো. তানভীর আলম ইএম-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এ পদে যোগ দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহার করে গণপূর্তে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন নিয়াজ তানভীর। ওই প্রভাব কাজে লাগিয়ে বদলি, টেন্ডার, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
৪০৬ কোটি টাকার কারাগার প্রকল্পে অনিয়ম: কেরানীগঞ্জে ৪০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ২০১৭ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি কমিটি গঠন করেছিল। ওই তদন্তে ৩৭ জন প্রকৌশলীকে দায়ী করা হয়েছিল এবং তাঁদের মধ্যে নিয়াজ তানভীরের নামও ছিল।
৬৮ লিফটের টেন্ডার নিয়েও অভিযোগ: ২০১৯ সালে মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে ৬৮টি লিফট স্থাপনের কাজে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগটি হলো, ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।
একই সময়ে আজিমপুর সরকারি কলোনির কার পার্কিং শেড নির্মাণ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলামকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে নিয়াজ তানভীরকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
সচিবালয়ের দায়িত্বেও: নিয়াজ তানভীরের বিরুদ্ধে সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনকালে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। সচিবালয়ের অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয় উঠে এসেছিল এবং তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
বর্তমানে ই/এম-৪ বিভাগের অধীনে সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজের দায়িত্ব রয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সরকারি টেন্ডার নথিতে তাঁর দপ্তরকে বিভিন্ন কাজের ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা যায়। যেখানে বিপুল অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করার অভিযোগ: নিয়াজ তানভীরের পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। খুলনার সাবেক সংসদ সদস্য ও সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের নামের সঙ্গে তাঁর পিতার নামের মিল থাকায় তিনি বিভিন্ন সময়ে ওই রাজনৈতিক নেতার সন্তান বা আত্মীয় হিসেবে পরিচয় ব্যবহার করতেন। এই পরিচয় ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাব বিস্তার, বদলি ও টেন্ডারে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাঁর প্রকৃত পিতৃপরিচয় কিংবা রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ওঠা বিকর্কে বলা হচ্ছে, নিজের স্বার্থে বাপকেও পাল্টে দিতে পারেন এই দুর্নীতিবাজ।
বদলি ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন: ইএম-৩ থেকে বদলি হওয়ার পর সরকারি আদেশের বাইরে প্রায় এক মাস দুই জায়গায় দায়িত্ব পালনের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সরকারি আদেশ অনুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তর ও দায়িত্ব গ্রহণের নথি পরীক্ষা করলেই এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গণপূর্তে গড়ে ওঠা একটি কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন: নিয়াজ তানভীরের বিরুদ্ধে চাকরিতে যোগদানের পর অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। রাজধানী ও খুলনায় ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি এবং পরিবারের সদস্যদের নামে গাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচার একটি ফ্ল্যাট নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেটি তাঁর নিজের মালিকানাধীন, নাকি ভাড়া নেওয়া-এ নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। স্ত্রী, সন্তান ও অন্যান্য আত্মীয়ের নামে সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি ক্রয় নথিতে সক্রিয়: অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি নথিতে দেখা যায়, নিয়াজ তানভীরের দপ্তর সাম্প্রতিক সময়েও সচিবালয় ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনার বিভিন্ন বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের টেন্ডার পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের একটি সরকারি ক্রয় নথিতে তাঁকে অনুমোদিত কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে; ওই টেন্ডারের চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। যেখানেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি: নিয়াজ মো. তানভীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আ.দৈ/আরএস




















