মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর সাজার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
নিজস্ব প্রতিবেদক :

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর, সুবিধাভোগী ও উগ্রু পন্থি রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনিদিষ্ট ৩ অপরাধের মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া ১০ বছর করে মোট ৩০ বছর কারাদণ্ডের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।বিচারিক আদালতের রায়ের ৫০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল গত ৩০ জুন সাবেক তথ্যমন্ত্রী ইনুর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন। এসময় তা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ এনেছিল ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। মামলার ৩৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রের সঙ্গে এক হাজার ৬৭৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র, তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও ডকুমেন্ট উপস্থাপন করা হয়।
বিচারে ইনুকে তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এগুলো প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ১০ বছর করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তাকে একসঙ্গে ১০ বছর সাজা খাটতে হবে। আর অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ থেকে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
ইনুকে ৩ নম্বর অভিযোগে সাক্ষী রাইসুল হকসহ ভুক্তভোগীদের রাজনৈতিক নিপীড়ন, নির্যাতন ও আহত করার দায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৬ নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও দুষ্কর্মে সংযোগের দায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ৭ নম্বর অভিযোগে অপরাধের ষড়যন্ত্রের দায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনের তদন্ত দল ইনুর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তদন্ত শুরু করে প্রতিবেদন দাখিল করে ১১ সেপ্টেম্বর। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক (ফরমাল চার্জ) অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। শুনানি নিয়ে গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগটি ছিল- ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাও’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দিয়ে বল প্রয়োগের উসকানি ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়- ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪ দলীয় জোটের সভায় সারাদেশে সেনা মোতায়েন করে কারফিউ জারি ও ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্তে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে নির্দেশ দেন।
তৃতীয় অভিযোগ অনুযায়ী- ২০ জুলাই দুপুরে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন দিয়ে আন্দোলনকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করে দমন ও হত্যার নির্দেশ দেন ইনু। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়- একই দিন দুপুরে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করে ছত্রীসেনা নামিয়ে ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোম্বিং করে হত্যার পরিকল্পনায় তিনি সহায়তা করেন।
পঞ্চম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়- ২৭ জুলাই বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘নিউজ টোয়েন্টিফোর’-এ আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী ট্যাগ দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন ইনু। ষষ্ঠ অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি মূলত আন্দোলনকারীদের ওপর পরিচালিত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সপ্তম অভিযোগ ছিল- ৪ অগাস্ট বিকেলে আন্দোলনকারীদের জঙ্গি তকমা দিয়ে কারফিউ জারির মাধ্যমে গুলি বর্ষণের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে এবং তা বাস্তবায়নে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া। সর্বশেষ অষ্টম অভিযোগে বলা হয়- ৫ অগাস্ট কুষ্টিয়া সদর মডেল থানা এলাকায় ইনুর নির্দেশে আব্দুল্লাহ আল মুস্তাকিন (১৬), সুরুজ আলী বাবু (৪১), আশরাফুল ইসলাম (৩৭), বাবলু ফরাজী (৫৮), ইউসুফ শেখ (৫৬) ও উসামা (১৮) নামের ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।
জাসদ সভাপতি ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট গ্রেফতার হন। পরে গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন ইনু। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়ায় নিজের আসনে তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
আ. দৈ./একে




















