গণআন্দোলনকালে ‘হাসপাতাপে জরুরি বিভাগ গুলিবিদ্ধ রোগী পরিপূর্ণ ছিল
নিজস্ব প্রতিবেদক

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুলিবিদ্ধ রোগীদের চালে ২০২৪ সালে রাজধানী ঢাকা সরাদেশে ছাত্র জনতার গণআন্দোলনকালে ‘হাসপাতাপে জরুরি বিভাগ পরিপূর্ণ ছিল। মেঝেতেও আহত ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এমন বর্ণনা দিয়েছেন আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’র শিক্ষার্থী মারজুকুর রহমান। আহত জুলাই-যোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটে ‘খ’ শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত তিনি।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন মারজুকুর। ওই মামলায় আসামি চারজন। তাদের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত-বিন-আলম। পলাতক অপর দুই আসামি হলেন পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।
জবানবন্দিতে মারজুকুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর আন্দোলনে যোগ দিতে রামপুরায় যান তিনি। বেটার লাইফ হাসপাতালের সামনে অবস্থানকালে আগের রাতে মামুন এবং ওই দিন সকালে রমজান নামে দুজন নিহত হওয়ার কথা জানতে পারেন। তার দাবি, বিজিবি ও পুলিশের গুলিতে তারা নিহত হন।’
তিনি বলেন, ‘আন্দোলন চলাকালে হেলিকপ্টার থেকে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হলে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এরপর পুলিশ ও বিজিবি গুলি চালাতে শুরু করে। তখন তারা রামপুরা টিভি ভবনের পাশের ফুটওভার ব্রিজের নিচে অবস্থান করছিলেন।’
মারজুকুর বলেন, ‘একপর্যায়ে তার বন্ধু মেহেদী হাসান জুমনের পায়ে গুলি লাগে। তাকে রেডক্রিসেন্টের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠলে গুলিবিদ্ধ অনেককে টেনেহিঁচড়ে, কাঁধে ও রিকশায় করে বেটার লাইফ হাসপাতালে নেওয়া হয়।’ ‘হাসপাতালের মেঝেতেও আহত ছাত্র-জনতাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল’—জবানবন্দিতে বলেন তিনি।
সাক্ষী আরও বলেন, ‘হাসপাতালে থাকার সময় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হলে তিনি মূল সড়কে বের হন। কিন্তু আবার পুলিশ ও বিজিবি গুলি চালানো শুরু করলে দৌড় দেন। এ সময় একটি গুলি তার ডান পায়ের টাখনুর ওপর দিয়ে ঢুকে ওপর দিয়ে বের হয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে কোমরে গুরুতর আঘাত পান তিনি।’
পরে বন্ধু মোর্শেদ, ভাই রাফি ও আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা তাকে বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে সেখানে গুলিবিদ্ধ রোগীর চাপ থাকায় ভর্তি হতে পারেননি বলে জানান তিনি।
পরে রেডক্রিসেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তাকে হলি ফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মারজুকুর বলেন, ‘ছাত্রলীগ ও যুবলীগ বিভিন্ন হাসপাতালে হামলা করছে—এমন খবর পাওয়ার পর ভর্তির দুই দিন পর তিনি হাসপাতাল ছেড়ে বন্ধু মোর্শেদের বাসায় আশ্রয় নেন। পরে সিএমএইচসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।’
নিজের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কোমরের আঘাতের কারণে এখনো নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।’
মারজুকুরের দাবি, ‘ওই সময় আরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে সমুদ্র, রেজওয়ান ও বাবু মোল্লার নাম উল্লেখ করে তিনি জানান, পরে তারা আন্দোলনে নিহত হন।’
জবানবন্দিতে ঘটনার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং ওই সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও বিজিবিকে দায়ী করেন মারজুকুর রহমান।
জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, বিজিবির রেজওয়ান ও রাফাত এবং পুলিশের ওসি মশিউর ও এডিসি রাশেদ গুলি চালিয়েছেন এবং গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
আ.দৈ./একে




















