শিক্ষিকা রনজিলা মৃত্যু: , ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ‘মূল’ ছিনতাইকারী দুজন
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীতে ছিনতাইকারীর টানে অটোরিকশা থেকে পড়ে প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। ঘটনার ১৮ দিন পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দাবি করেছে, রনজিলার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় জড়িত ছিলেন খোকন ও রাজীব মাতব্বর নামে দুই ব্যক্তি
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন রাজীব। পেছনে বসে থাকা খোকনই রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগে হ্যাঁচকা টান দেন। ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, রনজিলার ব্যাগ ও মোবাইল ফোনসহ বেশ কিছু আলামত উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে এ ঘটনায় এর আগে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন এখনো কারাগারে রয়েছেন। রাকিব হোসেন, পনি গাজী ও সেড্রিক জুলিয়ানকে গত ৩০ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
সে সময় র্যাবের দাবি ছিল, রাকিব ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক এবং অন্য দুজন তার সহযোগী। নতুন তদন্তে ডিবি বলছে, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ওই তিনজনের সঙ্গে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে র্যাব যে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছিল, সেটিও ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নয় বলে দাবি করেছে ডিবি।
যেভাবে ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা
গত ২৯ আগস্ট ভোরে স্বামী আবদুল মতিনের সঙ্গে অটোরিকশায় করে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ দিয়ে যাচ্ছিলেন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন। চোখের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য তারা ঢাকায় এসেছিলেন। জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের কাছে পৌঁছালে একটি মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি অটোরিকশার পাশে এসে রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেন।
এতে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। প্রথমে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরদিন ৩০ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন রনজিলার স্বামী। ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ছিনতাইকারীদের শনাক্তের কাজ শুরু হয়।
পরে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে খোকন ও রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির তথ্য অনুযায়ী, খোকনকে মিরপুরের মনিপুর পশ্চিমপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে রনজিলার ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেছে ডিবি। খোকনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিরপুরের বড়বাগ এলাকা থেকে রনজিলার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়।
ব্যাগের ভেতর তার ব্যবহৃত পোশাক, বাসের টিকিটের অংশ, চশমার বাক্স ও ওষুধ পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে রাজীব মাতব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয় সাভারের বিরুলিয়া এলাকা থেকে। ডিবির দাবি, ঘটনার সময় তিনিই মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে।রাজীবের কাছ থেকে ৬২২টি ইয়াবা উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে ডিবি।
রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে র্যাব তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারা হলেন রাকিব হোসেন, পনি গাজী ও সেড্রিক জুলিয়ান। গ্রেপ্তারের পর তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে ডিবির তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ডিবির প্রধান।
তার ভাষ্য, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তাদের সংশ্লিষ্টতা না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ডিবি আরও বলছে, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলের সঙ্গে র্যাবের উদ্ধার করা মোটরসাইকেলের রং ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে আগের তদন্তে উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটি ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়নি বলে দাবি করছে ডিবি।
র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজন এবং ডিবির হাতে নতুন করে গ্রেপ্তার দুইজন একই চক্রের সদস্য কি না—এমন প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছে ডিবি। ডিবির দাবি, তদন্তে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো যোগাযোগ বা যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। তাদের বসবাসের এলাকাও আলাদা। র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা তেজতুরীপাড়া এলাকায় থাকেন, আর খোকন ও রাজীব থাকেন পশ্চিম মনিপুর এলাকায়।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, তারা দুটি পৃথক গ্রুপের সদস্য। র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজনকে এই মামলা থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন ডিবির কর্মকর্তারা। তবে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা থাকলে সেসব মামলার আইনি কার্যক্রম চলবে। তদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনার সময় রনজিলার স্বামী আবদুল মতিন ছিনতাইকারীর চেহারা এক ঝলক দেখেছিলেন। স্ত্রীকে হারানোর পর তার মনে থাকা চেহারার বর্ণনা তদন্তকারীদের দেন।
ডিবির দাবি, সেই বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা খোকনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার হওয়া আলামত এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক রাজীব নিজেই। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মোটরসাইকেলটি নিজের বলে জানিয়েছেন।
মোটরসাইকেলটি কীভাবে কেনা হয়েছিল এবং এর অর্থের সঙ্গে আগের কোনো ছিনতাইয়ের যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ডিবির দাবি, রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ আটটি মামলা রয়েছে। খোকনের বিরুদ্ধে মাদক আইনে তিনটি মামলা থাকার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
র্যাব বিলুপ্ত হওয়ার পর বর্তমানে এসআরবি নামে পরিচিত বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছিল। এসআরবি-২-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড স্কোয়াড্রন লিডার নিফাজ রহমান বলেন, তদন্তের অংশ হিসেবেই তাদের গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ ও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পরবর্তী তদন্তে ডিবির কাজে সহায়ক হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, এখন ডিবি যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তারাই রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত জড়িত ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। র্যাব ও ডিবির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যাতে শাস্তি না পান, সেটিই তদন্তের লক্ষ্য ছিল বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ড ও কারাগারে থাকা তিনজনের স্বজনরা ক্ষোভ জানিয়েছেন। রাকিব হোসেনের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত না হয়েও যদি তার স্বামীসহ অন্যদের রিমান্ড ও কারাগারে যেতে হয়, তাহলে সেই হয়রানির দায় কে নেবে।পনি গাজীর বড় ভাই রনি গাজীও বলেছেন, তার ভাইসহ তিনজনকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত না হয়েও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় দুই দফায় গ্রেপ্তার এবং দুই ধরনের তদন্ত-তথ্য সামনে আসায় এখন মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—প্রথমে গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি কী ছিল এবং নতুন তদন্তে উঠে আসা দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণগুলো আদালতে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তদন্ত শেষ হলে এসব প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট হবে।
আ.দৈ/এসআর




















