৫ বছরের প্রেম, বিয়ে নিয়ে বিরোধ; ডলিকে হত্যার পর মরদেহ দ্বিখণ্ডিত
গাজীপুর প্রতিনিধি

গাজীপুরের জয়দেবপুরে খালের পানিতে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা থেকে নারীর দ্বিখণ্ডিত ও অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়ে বিরোধের জেরে ডলি আক্তার (৩০) নামে ওই নারীকে হত্যা করা হয়। পরে পরিচয় গোপন ও মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে মরদেহ দ্বিখণ্ডিত করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
সোমবার পিবিআই গাজীপুর জেলা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার জানান, এ ঘটনায় নিহতের প্রেমিক মিশন ইসলাম (২২), তাঁর মা বানু আক্তার (৪৩) ও সহযোগী মিজানুর রহমান মিল্টনকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, তিনজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই জানায়, ডলি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বাসিন্দা ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি গাজীপুরের জয়দেবপুরে একা ভাড়া বাসায় থাকতেন এবং একটি পোশাক কারখানায় সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। একই গার্মেন্টসে চাকরির সুবাদে মিশনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং একপর্যায়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
তদন্তে জানা যায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের ভাড়া বাসায় যান। সেখানে মিশন, তাঁর মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে খাবার খান। পরে বানু পাশের কক্ষে ঘুমাতে গেলে মিশন ও ডলি একই কক্ষে ছিলেন। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্বের বিভিন্ন বিষয় ও বিয়ে নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে মিশনের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ওই রাতে ডলিকে ঘুম ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হয়। তিনি ঘুমিয়ে পড়ার পর রাতের দিকে মিশন গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ও পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করেন বলে অভিযোগ। এরপর মরদেহ চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরদিন বানু আক্তার বিষয়টি দেখতে পেয়ে মরদেহ গুমের পরিকল্পনায় যুক্ত হন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
মরদেহ সুটকেসে না ধরায় ব্লেড ও বটি দা দিয়ে কোমর থেকে সেটি দ্বিখণ্ডিত করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। একাংশ সুটকেসে এবং অন্যাংশ প্লাস্টিকে মুড়িয়ে বস্তায় রাখা হয়। পরে মিশনের বন্ধু মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনা হয়। তাঁর সহায়তায় সুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলে রাজেন্দ্রপুর হয়ে ভবানীপুর এলাকায় নেওয়া হয়।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভবানীপুর ব্রিজের কাছে মিশন ও মিল্টন সুটকেস ও বস্তা খালের পানিতে ফেলে দেন। পরে মিল্টনের হাতে রক্ত লাগলে ভেতরে কী রয়েছে জানতে চাইলে মিশন তাঁকে ডলির মরদেহের কথা জানান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ভবানীপুর এলাকায় খালের পানিতে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে সেখান থেকে অজ্ঞাত নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সোর্সের সহায়তায় নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে।
নিহতের বড় ভাই সোহেল ১২ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও মরদেহ গুমের মামলা করেন। ওই দিনই মিজানুর রহমান মিল্টন, মিশন ইসলাম ও তাঁর মা বানু আক্তারকে পৃথক স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআই জানায়, মিশনের ভাড়া বাসা থেকে হত্যায় ব্যবহৃত বটি দা, মরদেহ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, ডলির জাতীয় পরিচয়পত্র, একটি বাটন মোবাইল ফোন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি সুটকেস কেনার তথ্য ও বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করেছে তদন্ত সংস্থা।
পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, মরদেহ অজ্ঞাত ও অর্ধগলিত অবস্থায় থাকায় শুরুতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। তবে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সোর্সের সমন্বয়ে দ্রুত নিহতের পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
আ.দৈ/আরএস




















