সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৫ দিনেই রামিসা হত্যার বিচার শেষ করা যাবে
পল্লবীতে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যা শিশু রামিসার বিচার শুরু: রাষ্ট্রপক্ষ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ৭:৪৬ পিএম   (ভিজিট : ৬৬)
X

দেশের বহুল আলোচিত  ও নিন্দনিয় ঘটনা রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান নেওয়া হয়েছে।

 রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ধারনা নিয়মিত বিচারিক আদালতে শুনানি হলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই বিচারকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

আজ সোমবার (১ জুন) আলোচিত এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের শুনানি শেষ হয়েছে। আদালত মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ করতে মঙ্গলবার (২ জুন) নির্ধারিন করেছেন।

আজ সোমবার সকাল থেকেই ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সকাল পৌনে ৮টার দিকে প্রিজন ভ্যানে করে আসামিদের আদালতে আনা হয়। বেলা ১১টার দিকে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে পুলিশের কড়া পাহারায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতের এজলাসে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর দিন ধার্য করেছেন আদালত।

ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী গণমাধ্যমকে বলেন, রামিসা হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত বিচার চায়। তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এখন বিচারিক কার্যক্রমও দ্রুত শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালত চাইলে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন শুনানি নিয়ে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে পারেন। রাষ্ট্রপক্ষ সেই প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করবে।’

পিপি আরও বলেন, মামলাটির গুরুত্ব ও জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তবে বিচারকাজ কত দ্রুত শেষ হবে, সেটি শেষ পর্যন্ত আদালতের কার্যক্রম, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ধারণা, সাক্ষীদের উপস্থিতি ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো জটিলতা না হলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই মামলার রায় দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

 পুলিশের চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, পেশায় অটোরিকশা মেকানিক সোহেল রানা গত ২০ মে মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে তিনি ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

জবানবন্দি অনুযায়ী, সাবলেটের অন্য সদস্যরা প্রতিদিন কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। ঘটনার দিন ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পাশের বাসার শিশু রামিসাকে দেখতে পেয়ে তিনি তাকে নিজের কক্ষে ডেকে নেন। পরে শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে যান। সেখানে রামিসা চিৎকার শুরু করলে তিনি তার মুখ চেপে ধরেন এবং মুখে কাপড় গুঁজে দেন। এরপর তাকে ধর্ষণ করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তার শরীরে পাওয়া সব আঘাত মৃত্যুর আগে বা জীবিত অবস্থায় সংঘটিত হয়েছিল। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতিরও বর্ণনা দিয়েছেন সোহেল রানা।

তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এলাকার লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা রামিসাকে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে শিশুটির মা তার কক্ষের সামনে রামিসার জুতো দেখতে পান এবং তাকে ডাকাডাকি শুরু করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে আশপাশের লোকজন তার কক্ষের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন।

৪৭ পৃষ্ঠার চার্জশিটে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া নিপুণ গত ২৪ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৪৭ পৃষ্ঠার চার্জশিট দাখিল করেন। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আদেশ দেন।

অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন গণমাধ্যমকে বলেন, মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(২)/৩০ ধারা এবং দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় দায়ের করা হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৯(২) ধারায় ধর্ষণের ফলে মৃত্যুর শাস্তির বিধান রয়েছে, ৩০ ধারায় অপরাধে সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ আছে এবং দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় অপরাধের আলামত নষ্ট বা গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।  তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া নিপুণ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর মৃত্যুর ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।’

মামলাটিতে মোট ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। বাদী হিসেবে রয়েছেন নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। প্রত্যক্ষ ও ঘটনাসংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন শেখ আবু সামা, মো. মনির হোসেন, রাইসা আক্তার এবং মোহাম্মদ জাকিরুল ইসলাম ওরফে রাজু।

এছাড়া সুরতহাল, জব্দ তালিকা ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন মো. মিজানুর রহমান লিটন, মাহমুদা খাতুন, মনিরুজ্জামান শাহীন, পারভীন আক্তার, এসআই রাশেদুল ইসলাম, রুমা আক্তার এবং কনস্টেবল মো. শরিফ মিয়া।

প্রযুক্তিগত ও বিশেষজ্ঞ সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইকবাল হোসেন, অন্য এক তদন্ত কর্মকর্তা এএসআই মো. ইসহাক আলী এবং সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির বিশেষজ্ঞ শুভজয় বৈদ্য। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনএ বিশেষজ্ঞের সাক্ষ্য মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।

সোহেল রানা দাবি করেন, তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নির্দোষ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ঘটনার পেছনে ‘ডলার’ নামে আরেক ব্যক্তির ভূমিকা রয়েছে। আদালত থেকে কারাগারে পাঠানোর সময় সোহেল রানা উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কাটছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামের একজন। আমি পাপ করছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।’

তিনি আরও দাবি করেন, রামিসাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পরে কারাগারে নেওয়ার সময় প্রিজন ভ্যানেও সাংবাদিকদের একই কথা বলেন সোহেল রানা।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি। ফলে ‘ডলার’ নামে উল্লেখ করা ব্যক্তির পরিচয়, অস্তিত্ব কিংবা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিষয়টি যাচাই করা হতে পারে, তবে বর্তমানে মামলার অভিযোগপত্রে এমন কোনো ব্যক্তির নাম বা সম্পৃক্ততার উল্লেখ নেই।

পিপি আরও বলেন, মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। আসামিপক্ষ যেসব দাবি করছে, সেগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত মূল্যায়ন করবেন। তবে এখন পর্যন্ত তদন্তে সংগৃহীত আলামত, ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রমাণে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে আদালতে সোহেলের নতুন বক্তব্যের কোনো সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (স্পেশাল পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু সোহেলের ‘ডলার’ সংক্রান্ত বক্তব্যকে ‘ম্যাটার অব ট্রায়াল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আসামি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন, সেগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। ম্যাটার অব ট্রায়াল নিয়ে কোনো মামলার ডিসচার্জ হয় না। পুলিশ রিপোর্টে যেটা আমরা পাইনি, সে বিষয়ে প্রসিকিউশনের কিছু বলার নেই। আর ডিফেন্স থেকে যা বলা হয়, সেগুলো ম্যাটার অব এভিডেন্স, যা প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।’

প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরবর্তীতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের নির্দোষ দাবি করছে। ফলে এখন আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন ও জেরা পর্বের ওপরই নির্ভর করছে বহুল আলোচিত এই মামলার চূড়ান্ত পরিণতি। রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা, ধারাবাহিক শুনানির মাধ্যমে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে স্বল্প সময়ের মধ্যেই মামলার রায় ঘোষণা করা সম্ভব হবে।

আ. দৈ./কাশেম


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝