অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ২৬৫ আইন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে আইনজীবীদের ক্ষোভ
নিজস্ব প্রতিবেদক :

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ২৬৫ জন আইন কর্মকর্তা নিয়োগকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া কয়েকজনের রাজনৈতিক ভূমিকা ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাদের অপসারণের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীদের একটি অংশ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনে সক্রিয় ও অভিজ্ঞ অনেক আইনজীবী নিয়োগ থেকে বাদ পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
এ পরিস্থিতিতে বিতর্কিত নিয়োগের বিষয়টি পর্যালোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি ও সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক আইনজীবী। বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাসও এসেছে।
আইনজীবীদের অভিযোগ, নতুন নিয়োগের তালিকায় এমন কিছু ব্যক্তি স্থান পেয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও অতীত ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় এবং পেশাগতভাবে যোগ্য অনেক আইনজীবীকে তালিকায় রাখা হয়নি।
বিএনপির আইনজীবী গাজী কামরুল ইসলাম সজল বলেন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগের বিষয়টি আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। তার দাবি, ‘গুপ্ত ও সুপ্ত ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনও তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। অথচ দীর্ঘদিন আন্দোলনে থাকা অনেক অভিজ্ঞ আইনজীবী বাদ পড়েছেন।
তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্বে রাখা হলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেলেরও কিছুটা দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে পুরো তালিকার বিষয়ে তিনি সব তথ্য জানতেন না এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়ে সংশোধনের পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে বলেও জানান সজল।
বিষয়টি সমাধানে বিএনপি, সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে পুনর্নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছিল। কিন্তু নতুন তালিকায় দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা এবং দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক আইনজীবী বাদ পড়েছেন।
তবে প্রতিবাদের ধরন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কোনো সমস্যা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। যারা বাদ পড়েছেন এবং আগে আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের অনেককেই পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাবেক বিচারক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজীর অভিযোগ, গত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি-নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেক আইনজীবী এবার নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন।
তার দাবি, যোগ্যতার পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক সুপারিশ, চেম্বারের সম্পর্ক, আত্মীয়তা ও আঞ্চলিকতার মতো বিষয় নিয়োগে প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ফয়সাল মাহমুদ ফয়েজী বলেন, নির্দিষ্ট কোনো আইনজীবী ফোরাম থেকেই সবাইকে নিয়োগ দিতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। তবে আওয়ামী লীগ বা স্বৈরাচারী শাসনের সহযোগী হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের নিয়োগ না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিএনপির আইনজীবী ফোরামের প্রচার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান খানও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কিছু অনিয়ম এবং রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, যোগ্য অনেক আইনজীবীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগের ক্ষেত্রে সবাইকে একভাবে বিবেচনা না করে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে নিয়োগের প্রতিবাদে আদালত অঙ্গনে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বিএনপির ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন মাহবুবুর রহমান।
ব্যারিস্টার মো. সাইফুল আলম উজ্জ্বল বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়ায় সমস্যা রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের পর আইনজীবীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান নিয়োগে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট আইনজীবী সংগঠন থেকেই সব নিয়োগ দিতে হবে—এমনটি তিনি মনে করেন না। তার মতে, আওয়ামী লীগ বা স্বৈরাচারী শাসনের সহযোগী হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ রয়েছে, তাদের নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা যাচাই করা সম্ভব। প্রয়োজনে প্রকাশ্য যাচাই, সাক্ষাৎকার কিংবা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
সাইফুল আলম উজ্জ্বল বলেন, ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। এ জন্য বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা প্রয়োজন। তবে প্রতিবাদের নামে অশালীন স্লোগান ও বিশৃঙ্খলা আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইলিয়াস আহমেদ মণ্ডলও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ করেন। তার মতে, যোগ্য এবং দীর্ঘদিন ধরে দলের জন্য কাজ করা অনেক আইনজীবী যথাযথভাবে মূল্যায়ন পাননি।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্থায়ী ও দীর্ঘদিনের আইনজীবীদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তবে অসন্তোষ প্রকাশের ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে ইলিয়াস আহমেদ মণ্ডল বলেন, আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম বদরুদ্দোজা বাদল অবশ্য পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘এখন সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে।’ নিয়োগ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবেই বিষয়টি সমাধানের দিকে এগোচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সিদ্ধান্ত আসবে, যা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন পরিস্থিতিকে ‘বেশ বড় ধরনের অস্বস্তিকর’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক আইনজীবী এবার নিয়োগ থেকে বাদ পড়েছেন।
তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনের বাইরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া আইনজীবীদের পাশাপাশি সরকারের জন্যও বিব্রতকর। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা চলছে।
মাহবুব উদ্দিন খোকন আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। দ্রুতই এ বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করছেন তিনি।
সব মিলিয়ে ২৬৫ আইন কর্মকর্তার নিয়োগ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন আলোচনার টেবিলে সমাধানের দিকে এগোচ্ছে। বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ যাচাই, বাদ পড়া যোগ্য আইনজীবীদের পুনর্বিবেচনা এবং ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া—এই তিনটি বিষয়ই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনের আইনজীবীরা।
চাইলে এটিকে আমি আরও চটকদার অনলাইন নিউজের স্টাইলে, সঙ্গে ৫টি বিকল্প শিরোনাম ও একটি শক্তিশালী লিড দিয়েও সাজিয়ে দিতে পারি।
আ. দৈ./একে




















