শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
Ajker Dainik
বইমেলায় বিদায়ের সুর

প্রাণের মেলায় নিষ্প্রাণ লিটল ম্যাগ

আজকের দৈনিক | আব্দুর রউফ

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৪, ০৮:০৫ পিএম

প্রাণের মেলায় নিষ্প্রাণ লিটল ম্যাগ
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তমঞ্চ সংলগ্ন তালতলায় লিটলম্যাগ চত্বর

একে একে কেটে গেলো অমর একুশে বইমেলার ২৭টি দিন। সময় না বাড়লে নিয়মানুযায়ী হাতে রয়েছে কেবল দু’দিন। মেলার শেষ সময়ে বেশ জমজমাট বইমেলা। এ সময়ে বইপ্রেমীরা যেনো খালি হাতে ফিরতে নারাজ। তাই প্রায় সব স্টল-প্যাভিলিয়নে আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছে বলে জানা যায়। এতে লেখক-পাঠকের পাশাপাশি প্রকাশকেরাও ব্যাপক খুশি। 


তবে পুরো মেলায় ভিন্ন এক চিত্র দেখা যায় লিটল ম্যাগ চত্বরে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তমঞ্চ সংলগ্ন তালতলায় পড়েছে এবারের লিটলম্যাগ চত্বর। গত কয়েক বছরের মতো এবারও চত্বরটিতে নেই যেন প্রাণের ছোঁয়া। ১৭০টি স্টলের মধ্যে এখন পর্যন্ত চালুই হয়নি অনেক স্টল। মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। স্টল বরাদ্দ পেয়েও লোকসান হবে ভেবে অনেকে এখানো স্টল চালু করেননি। আবার কয়েক দিন মেলায় থাকার পরও হতাশ হয়ে স্টল খুলছেন না অনেকে। গতকাল বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, মেলার অন্যত্র ভিড় থাকলেও লিটল ম্যাগ চত্বর ফাঁকা।


বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বইমেলার একটি অন্যতম আকর্ষণ ছিল লিটল ম্যাগ চত্বর। কিন্তু সময়ের আবর্তে একসময়কার তুমুল জনপ্রিয় এই চত্বরে এখন কেবলই হাহাকার। বঞ্চনা, অবহেলায় দীপ্তি হারিয়েছে লিটল ম্যাগাজিন। বারবার এর স্থান পরিবর্তন হলেও হারানো গৌরবের দেখা পাচ্ছে না এই চত্বর।


সাফল্য ম্যাগাজিনের সম্পাদক ফজলে রাব্বি বলেন, মেলা তো জমেছে ঠিকই। কিন্তু লিটল ম্যাগ চত্বরে পাঠক-দর্শনার্থী নেই বললেই চলে। এমন জায়গায় লিটলম্যাগ চত্বর ফেলেছে, যা কারও চোখে পড়ে না।


দোলন-এর সম্পাদক কামাল মোস্তফা বলেন, পুরো মেলায় লিটলম্যাগ অবহেলিত। মেলার পরিবেশের সঙ্গে এখানকার পরিবেশের মিল নেই। আমরা তো বেশি কিছু চাই না, আমাদের চাওয়া একটু সুন্দর পরিবেশ, যেখানে বসে আমরা আড্ডা দিতে পারবো। লিটলম্যাগ চত্বর মানেই তো এই! তারপর দেখুন লাইটের কি বাজে অবস্থা!  এর চেয়ে মাছ বাজারে আরও ভালো লাইট থাকে। আমরা বার বার বলেও সমাধান পাইনি।


নব ভাবনা ম্যাগাজিনের বিক্রয়কর্মী জোবায়ের জানান, দিনব্যাপী পাঠকশূন্য অবসর সময় কাটাতে হয় এই চত্বরের বিক্রয় প্রতিনিধিদের। কেবল যেসকল লেখক এসব ম্যাগাজিনে লিখে থাকেন তাদেরই আনাগোনা থাকে এই অঙ্গনে। তিনি আরো বলেন, আমাদেরকে এমন জায়গায় স্থান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যেখানে অনেকটাই অন্ধকার বিরাজ করে। মেলার মূল অংশে স্থান না দেওয়ায় আমাদেরকে অনেকটাই দলছুট বানানো হয়েছে।


পাঠকদের একজন বলেন, ৮০ ও ৯০-এর দশক থেকে সাহিত্যচর্চায় নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিল লিটল ম্যাগ আন্দোলন, তা যেন ধীরে ধীরে প্রাণ হারাচ্ছে।

জানা যায়, মূলত উনিশ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকা ও ইউরোপে লিটল ম্যাগাজিনের যাত্রা শুরু হয়। বাংলায় একে সর্বপ্রথম পরিচিত করান বুদ্ধদেব বসু। ১৯৫৩ সালে ‘সাপ্তাহিক দেশ’ পত্রিকার মে সংখ্যায় তিনি তার সাহিত্যপত্র প্রবন্ধে সর্বপ্রথম লিটল ম্যাগাজিনের সাথে এদেশের সাহিত্য প্রেমীদের পরিচয় করিয়ে দেন। লিটল ম্যাগ বা লিটল ম্যাগাজিনগুলো সাধারণত গতানুগতিক ধারার বাহিরে লেখা প্রকাশ করে থাকে। আর এইসব ম্যাগাজিনে যারা লিখেন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা হয়তো একেবারেই নবীন কিংবা পাঠক বিচ্ছিন্ন লেখক।


বইমেলায় লিটলম্যাগ স্টল বসে ২০০১ সাল থেকে। সে বছর বাংলা একাডেমির বহেড়া তলায় লিটলম্যাগ নিয়ে কয়েকজন বসেছিলেন। ২০০৬ সাল থেকে বইমেলায় লিটলম্যাগ কর্নার যুক্ত হয়। সেসময় লিটলম্যাগে কবি-লেখকদের আড্ডা হতো। পক্ষে বিপক্ষে তর্কবিতর্ক হতো। তরুণ-প্রবীণ প্রথাবিরোধী লেখকদের মিলনমেলা ছিল এটি। বইমেলার পরিসর বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০১৯ সালে লিটলম্যাগকে নিয়ে আসা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে সরে আসার পর থেকেই লিটলম্যাগ তার জৌলুস হারিয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। 


আজ মঙ্গলবার মেলা শুরু হয় বিকেল ৩টায়, চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন নতুন বই জমা পড়ে ৯৫টি।  এর মধ্যে রয়েছে গল্প ১৯টি, উপন্যাস ৮টি, প্রবন্ধ ৭টি, কবিতা ৩২টি, গবেষণা ১টি, ছড়া ৩টি, শিশুসাহিত্য ৩টি, জীবনী ২টি, রচনাবলি ১টি, মুক্তিযুদ্ধ ২টি, নাটক ১টি, বিজ্ঞান ৪টি, ভ্রমণ ১টি, ইতিহাস ২টি, রাজনীতি ১টি, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ২টি, বঙ্গবন্ধু বিষয়ক ১টি, ধর্মীয় ১টি, অন্যান্য ৪টি।


বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : সেলিম আল দীন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লুৎফর রহমান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন রশীদ হারুন এবং জাহিদ রিপন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাট্যজন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ।


হুমায়ুন আজাদ দিবস পালন: এদিকে বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদের উপর সন্ত্রাসী হামলার দিনে গতকাল বিকেল ৫টায় লেখক-পাঠক ফোরামের উদ্যোগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার তথ্যকেন্দ্রের সামনে এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। বিশিষ্ট প্রকাশক ওসমান গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। বক্তৃতা প্রদান করেন কবি মোহন রায়হান, কবি আসলাম সানী, প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ।


লেখক বলছি মঞ্চ: এ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক রেজানুর রহমান, শিশুসাহিত্যিক মানজুর মুহাম্মদ, কবি রণক মুহম্মদ রফিক এবং গবেষক অমল গাইন।  

 
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান: সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি রওশন ঝুনু, হাসনাইন সাজ্জাদী, মাহী ফ্লোরা এবং মোস্তাফিজুর রহমান। আবৃত্তি পরিবেশন করেন পারভেজ চৌধুরী, কুমার লাভলুসহ অন্যান্য আবৃত্তিশিল্পী। এছাড়া ছিল সালাউদ্দিন বাদলের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আওয়ামী শিল্পীগোষ্ঠী’, মোশাররফ হোসেনের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘দৃষ্টি’, মোস্তাফিজুর রহমানের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভাওয়াইয়া অঙ্গন’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী লিলি ইসলাম, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, চঞ্চল খানসহ অনেকে।

 

আ.দৈ/এ রউফ
 

Link copied!