শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
Ajker Dainik

চিত্রকল্পের ম্যাজিক-মৌ মুগ্ধতা মাহবুব হাসানের কবিতা

আজকের দৈনিক | কবি হাসান আলীম 

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৪, ০৯:৫৮ পিএম

চিত্রকল্পের ম্যাজিক-মৌ মুগ্ধতা  মাহবুব হাসানের কবিতা
মাহবুব হাসানের কবিতা

বিংশ শতকের সাত-এর দশক প্রচলিত সত্তুর দশকের মেধাবী এবং বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, ব্যাতিক্রমী কবি মাহবুব হাসান। আধুনিক এবং উত্তর আধুনিক কালের হাতে গোনা কয়েক জন কবির মধ্যে তিনি ব্যাতিক্রমী এবং চিত্রকল্পের মেধাবী কবি। জন্ম জেলা টাঙ্গাইল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে বি.এ অনার্স ;এম.এ; এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রির অধিকারী। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গবেষণা কর্মে তিনি সব্যসাচী লেখক। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসিমউদদীন, জীবনানন্দ দাশ, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, বিনয় মজুমদার এই কয়েকজন মেধাবী কবি এবং ব্যাতিক্রমী কবির সরণিতে তিনি অন্যতম। তার প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থের মধ্যে 'তন্দ্রার কোলে হরিণ'(১৯৮৪), 'তোমার প্রতীক'(১৯৮৬), 'নিসর্গের নুন',(১৯৯০), 'আমার আাকাশ'(১৯৯৮), 'স্বপ্নগুলো বিক্রি হয়ে গেছে' (১৯৯৯), 'নির্জন জানালা '(২০ ০০),' তিনি কথক ছিলেন'(২০০১),'তাজা গ্রেনেড কিংবা দিবাস্বপ্ন' (২০০২), 'তোমার অহনা(২০০২)','চাঁদে পেয়েছে আমাকে সেই ছেলেবেলা '(২০০৫),'পরীর পঙক্তিভোজ',(২০০৮), 'শূন্যতার কাঁটাতারে শুয়ে আছি ',(২০১৭), প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। 
মেধাবী কবিরা সাধারণত সরাসরি, সহজ সরল কবিতা লেখেন না। তুলনা, প্রতি তুলনা,উপমা উৎপ্রেক্ষা তথা অলঙ্কারময় কাব্য ভাষায় কল্পনার বহু বর্ণীল চিত্রকল্পের মনোহারিত্বে কবিতা রচনা করেন।  শক্তিশালী এবং ব্যাতিক্রমী কাব্যভাষা ও জীবন দর্শন সঞ্জাত অভিজ্ঞতার মেঘ-মেঘালীতে, জোছনা -রোদের আলো-আলেয়ার কবিতা লেখেন কবি মাহবুব হাসান।  একটা ক্ষিপ্র হরিণের উৎকর্ণ চোখের মায়াবী জোছনার সমুদ্র জোয়ার রয়েছে তার কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে। মন ভরে যায়। এক অনির্দিষ্ট অনির্বচনীয় রাজ্যাভিষেকের আনন্দে হৃদয় উপচে ওঠে, জোছনা বৃষ্টি ঝরে কল্পনার বন্দরে। পাঠকও হয়ে যায় মৌন মুগ্ধতার কবি। বাংলা সাহিত্যে বিশেষত : রবীন্দ্র উত্তর আধুনিক এবং উত্তর আধুনিক কবিতা জগতে চিত্রকল্পের বড়ো কবি খুব বেশি নেই। নজরুল, জসিম উদ্দিন, জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, এবং মাহবুব হাসান আমাদের শতবছরের বাংলা কবিতায় চিত্রকল্পের নতুন রূপকার। অনেকে বলতে পারেন বড়ো কবিরা তো কবিতা লেখেন চিত্রকল্পের মাধ্যমে, তারা তো সরাসরি কাব্য, পদ্যের পদ রচনা করেন না। এখানে নতুন কি বলার আছে? এরা তো ভালো লিখবেই, কিন্তু আমার আলোচনাটা সেখানে নয় বরং অঙ্গুলিমেয় যে ক'জন কবি রয়েছেন তাদের সৃষ্ট চিত্রকল্পের মনোহারিত্ব নয়, তারা কি ভাবে নতুন চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন তা কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা। এখানে কারো সাথে তুলনামূলক আলোচনাও করবো না কেবল একজন কবি, প্রচণ্ড মেধাবী কবি মাহবুব হাসান কেমন নতুন চিত্র কল্প নির্মাণ করেছেন তার কিছু নমুনা উল্লেখ করবো। মাহবুব হাসান সত্তর দশক থেকে কবিতা লিখে চলছেন। সত্তরের আবুল হাসান, মাহবুব সাদিক, আবিদ আজাদ, নাসির আহমেদ, বিমল গুহ, অসীম সাহা সহ আরও অনেকে ভালো কবিতা লিখছেন। আমাকে আবুল হাসান যে পরিমাণ আকর্ষণ করেছিল তার চেয়ে প্রবলভাবে টানছেন শ্রদ্ধেয় কবি মাহবুব হাসান, না এটা আমার কোন ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার কারণে নয় বরং তার কবিতার পরম-বিধ্বংসী,সুন্দর-আগ্রাসী নতুন চিত্রকল্পের কারণে। 
মাহবুব হাসান সব ধরনের চিত্র কল্প বিশেষ করে দৃশ্যমান চিত্রকল্প ,ধ্বন্যাত্মক চিত্র কল্প , স্পর্শময় চিত্র কল্প , জৈবিক বা মনো-দৈহিক চিত্র কল্পের মধ্যে স্পর্শ ময় চিত্র কল্প, জৈবিক চিত্র কল্প এবং কোন কোন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান চিত্র কল্প নির্মাণে চমৎকারিত্ব প্রদর্শন করেছেন।  মাহবুব হাসানের চিত্রকল্প নির্মাণের যে নতুনত্বটি তা হলো লোকায়ত সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে আধুনিক ও উত্তর আধুনিক উপকরণের মিথস্ক্রিয়া, সিনথেসিস! জসিমউদদীন, জীবনানন্দ, আল মাহমুদের চিত্রকল্পে যে গ্রাম বাংলার লোক ঐতিহ্য, নৃতত্ত্ব ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রয়েছে তা থেকে ভিন্ন কিন্তু প্রায় সেই মত সুন্দরের সাথে উত্তর আধুনিক প্রযুক্তি মিশেলের প্রাণ গন্ধী এক অবিনাশী প্রাণপঙ্ক চিত্রল চিত্রাহরিণি চিত্রকল্প বিনির্মান! আমি বিস্মিত মাহবুবের স্পর্শময় ও জৈবিক মনো-দৈহিক চিত্র কল্প নির্মাণের মনোহারিত্বে- 'একটি বিদ্যুৎমতী চড়ুইয়ের ঠোঁটের মতন শক্ত ও কারুকাজময় ভালোবাসা, /আমি তোমার উষ্ণ ফণার দুলকি থেকে সাপের বিষের মতো/মৃত্যুময় ভালোবাসা চাই'(না/তন্দ্রার কোলে হরিণ) কিংম্বা মাহবুব তার প্রেয়সীর জন্য বলেন-'বিমানবালারা যে রকম আকাশের উঁচু গ্রীল থেকে /হাওয়াই চপ্পল পরে/ মেঘের সজল উরু বেয়ে নেমে আসে /তৃষ্ণার্ত এরোড্রামের কালো পথে /আমি ও ভোরের দোয়েলের মতো/ তীক্ষè শিস দিয়ে নেমে আসবো বেদনাপিষ্ট ফুটপাথে,/ এপ্রিলের খররোদে।/উল্টোপাল্টা খা-খা বাতাসের ছুরির টানে কাটা/ ফালি ফালি তরমুজের মতন/তাজা আর লাল আমার হাওয়াই হৃদয়ে /কার্ভ-করা কাঠের হাতলের মতো /এক সুন্দরীর গ্রীবা সঙ্গে নিয়ে / ফিরে যাবো, হ্যা যাবোই।(খাবো কিংবা খাবো না/তন্দ্রার কোলে হরিণ) কিংবা যখন বলেন -'খাবো, /এই ঝা ঝা গোখরোমুখো সাপের ফণার ঝিলিক, /পাখির সুস্বাদু হৃদপিণ্ডের মতন চেটেপুটে খাবো/ ফ্রিজের প্রায়ান্ধকার মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থেকে শীতল পানীয়ের মতো / খুব তৃপ্তিতে মুখ রাখবো রৌদ্রের ঘুমে / সর্বাঙ্গ সুন্দর খাবো কামুকতা দিয়ে, / এই আমি খেয়ে নেবো মহিলার স্তনাগ্রের হিম;(ঐ)
তখন কবিকে নারীর রূপখেকো বলে মতিভ্রম হতে পারে। আসলে তিনি কিন্তু মিতব্যয়ী শব্জিভোজি।
-' না না আমি খাবো না,কিছুতেই খাবো না/ এই আদিভৌত শাদা ভাত,/ ওগুলো এখন একচেটিয়া ছা-পোষাদের হয়ে গেছে, /ওগুলোতে জমে গেছে দুপুরবেলার অলস মেদুর নুন/ জীবনের ঘুণ/ আমি চাই, / দুপুরের লাঞ্চে থাক হরিণীর মতন স্মিত চোখের অম্লান কথা বলা,/ হলুদ পাতা ঝরে পড়ার মতো / সব্জিভরা আমার প্লেট ভরে যাক/ সোনালি ভোরের মৌন দুঃখে।(ঐ) অর্থাৎ তিনি শ্লিল সৌন্দর্যের দুঃখি। 
মাহবুব হাসান আমাদের আধুনিক -উত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার এক আশ্চর্য কবি পুরুষ। তাঁর কবিতার উপর দরকার ব্যাপক অধ্যায়ন, গবেষণা। নতুন বিষয় আশয় রয়েছে তাঁর কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে। অসাধারণ কাব্য ভাষা তাঁর। যে কোন বোদ্ধা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন তিনি। তাঁর অনেক কবিতার ভিড় থেকে কিছু আশ্চর্য সুন্দর চিত্র কল্পের উদ্ধৃতি দিয়ে পরবর্তী সোপানে পদার্পণ করবো।
১.তাহলে তুমিই সেই রুদ্ধদ্বার ভোরবেলা?/ মুখ-থুবড়ে পড়ে থাকা একটি বিস্ময় বিমূঢ়/ পায়ের ডিমের মতো হতবাক;
২.খরগোশের গুটিগুটি আমার আকাঙ্ক্ষার জালে/চিতল মাছের মতো ধূমল ঈর্ষার ঢেউ তোলে,
৩.একটি গানের ভেতর দিয়ে হরিণের পা ছুটছে লেকের ধারে/জ্যোতস্নার কফিন থেকে গলগলিয়ে বেরুচ্ছে/ বন্য কেয়া,কাঠমল্লিকা আর/ হাস্নাহেনার রহস্যমদির সুগন্ধি রুমাল;
৪. সুনীল আকাশে বসে শারদীয় মেঘের মেয়েরা / খোপা খুলে পৃথিবীর তন্দ্রাচ্ছন্নতা দেখে/ দুঃখে বেদনার্ত হয়; তাদের শারদ /চোখের কোণে কি ঝিলিক দিয়ে ওঠে বর্ষার ধারা/
৫.এক ফাঁকে রান্না -করা ইলিশের বাশনার মতন /চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চাঁদ / আহা! ভাঙা চাঁদ! 
৬. ঠিক মানুষের মতো দেখতে কিন্তু মানুষ নয় / গায়ে সজারুর কাটা / আর আছে শিং মাথার মগজে! 
৭.তুমি আদমের বুকের আঁধার ছেঁকে -তোলা মানব রমণী / অথচ তোমার পরাচৈতন্য জুড়ে ওড়াউড়ি / টালমাটাল আলোকরশ্মির মতো কম্প্রমান রাত্রির আকাশ তোমার / তুমি মধ্যযাম কামে-গন্ধে/ উন্মাতাল করে রাখো/ রাত্রির আঁধার মাখো সুন্দরের চোখে। 
৮.তবু কাকস্যপরিবেদনায়স্নাত মানব সমাজ কাকলাসের মতন রক্তনধর হয়/
কাকের সমাজে থুতু ফেলে / নিজের ঘৃণার দলা উগড়ে দিয়ে / কাকের মতন কা-কা-কা-কা ঝগড়া -বিবাদ করে /এই দেখে দল বেধে আসে কাক আর কাকির জ্ঞাতিরা /ছো-মারে, ছল -ছুতোয় ভরা কিরা-খাওয়া মানুষ -সমাজ ;
৯. লোকজ শরমে নারী অঙ্গে ধরো প্রেমের কবিতা / তোমার রূপের বন্যা পলিময় করেছে আমাকে/ রাতের আঁধার থেকে উঠে আসে পরাণের সীতা /
অসংখ্য তারার মাঝে ফুটে আছো হৃদয়ের বাঁকে। 
১০. কার্তিকশাইল ভূমি ছেড়ে যাবো না কোথাও/ কেন ডাকো পশ্চিমা পিরীতি 
শাদা তন্তুজালে বোনো আমার মগজ!/ রিনি,তোমার উঠোন ছেড়ে যাবো না এক পা'ও!
১১.তুমি এ দেশের অ্যাডোনিস/বঙ্গগর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছো তুমি প্রেমের পরাণ/
ঈর্ষাকাতর আরেসের হিংস্র বরাহ গুতোয় তোমার শ্যামাঙ্গী মা/রক্তাক্ত হলো ঊনিশশ'একাত্তরে/ বারুদভরা আগুনদিনে
১২. সোনাঞ্জুল-বরণের পেট থেকে শিশির ঝরিয়ে দিয়ে / কেটে নিয়েছি কতোবার ধানের সৌষ্ঠব -সৌগন্ধ / আর চালের শাদা দুধ!/ এই ধবল জ্যোতস্নায়, / ইদুরের চোখের তারার মতোই কম্প্রমান/ চকচকে ধারালো তীক্ষ্ণ দাঁত সেই আপেলে/ বসালাম -/ মেয়েটি আমার নগ্ন দাঁতের আঘাতে চমকে উঠলো এবং ভয়ে চিতকার করলে-/আমি ফিরে এলাম চাঁদনিবিছানায়-/ সে ঘৃণা -উগরানো চোখে আমার/ নগ্নতাকে ঢেকে দিতে দিতে তিরস্কারের বাতাস বইয়ে দিলো।
১৩.ধরো,/ সঙ্গমাতুর কোনো উত্তেজক সময়ে তোমার প্রাণবায়ু থমকে গেলো!/
শুধু তোমার মৃত্যু নেই, কেবল জন্ম,/মানব জনম-/কেননা,তুমি লোকজ গল্পের সেই রাক্ষস, যার/মাথা কাটা গেলে / আরেকটা জন্মায় যাদুই স্পর্শে / ক্লোনিং, তোমার নব্বই বছরি দেহে বাইশ বছরি তেজ/ দানব ইতিহাস! 
এ রকম আরও অসংখ্য চিত্রকল্প রয়েছে মাহবুবের কবিতার পঙক্তি -ঠোঁটে! অবাক আশ্চর্য্য সুন্দরের বাঘ-চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে, গা শিউরে ওঠে তাঁর কবিতার সংসারে প্রবেশ করলে। সহজে বের হওয়া যায়না কেবল প্রেম, কেবল পরকীয়া, ভালোলাগা ভালোবাসা, সোহাগের ঝাড়বাতি কিংবা কোনো হিম-সন্ধ্যার জোনাক-মাধুরি -মলয়!  জৈবিক মনো-দৈহিক, স্পর্সের, দৃশ্য বর্ণনার রকমারি চিত্রল-চিরল-চিত্রকল্প ছাড়াও মাহবুব সমাজ-রাজনীতি সচেতন চিত্র কল্প নির্মাণে নতুনত্ব, মৌলিকত্ব দেখিয়েছেন। সৃষ্টি করেছেন নতুন চিত্রকল্প। তাঁর এমন কিছু দুর্লভ চিত্রকল্পের উদ্ধৃতি দেওয়া যায়।
১.অগম জঙ্গলে নিয়েছে আশ্রয় ভিতুর ডিম-খেকো দেবতারা/আজও কি সেই ধারা? জনতা-জনপদ শ্বাপদ পৃথিবীর অলীক রীতিনীতি অটুট রেখেছেন? / নাহলে অসুরের কেন/সদল গর্জন?/ধবল জ্যোৎস্নার উতস-মগডালে গুহ্য-ক্ষমতার আগুন জ্বালিয়েছে? / কি করে নাচে তারা?/ পরান্নভোজী ঐ/পাতক পাতকীরা?
২.ননী খুঁজে লাভ নেই ;/কৃষ্ণ চোরার লোভের জিহ্বায় সবটুকু গেছে /চেটেপুটে খেয়ে গেছে হাঁড়ির তলদেশ, বাদবাকিটুকু/এ-কালের খোলাবাজারি বাইন্যার দল/
বাংলা কবিতাও আজ ননীহীন, খর্খরে! পলও উধাও!
৩.তসবি দানার মতো তোমাকে শুনেছি রোজ/ সুবেহসাদিকে জায়নামাজের আদুল শরীরে বসে/সাধনার জপমালা যেন/ আমার মনের বন্ধ দরোজা সহসা খুলে দেবে, আর আমি / আয়াতমগ্ন নিমীলিত চোখে / তোমার প্রশান্ত মুখ চেখে দেখতে থাকবো তৃষিত বেড়ালের মতো;/
৪. এ-রকম একটি নদীর কথা আমি ভাবি/সে-নদীতে মানুষ আর কুমির সমান সমান ;
৫.মানুষের কান্না চুরি করে নিয়ে গেছে গোয়েনির্কা। / তাবেদাররা সেই চাপা-পড়া আর্তনাদে শুনতে পাচ্ছে বেহেশতের শান্তি! /
৬. মানুষ কাঁদছে অবিরল /ডাকিনি বিদ্যায় ভরে উঠেছে শ্যামল বাংলা আমার /জ্ঞানের ভারে নুয়ে পড়েছে শাসকের ডালপালা /যেন রাজশাহী আর চাপাইয়ের আমের বাগান/
৭.আমাদের স্বপ্নের বাশনা পুলিপিঠার মতো ফুলে ওঠা রাজহাঁস! /তুলে রেখেছি স্বপ্ন-কল্পনার ঝোলায়। স্বপ্নের ঝোল-বারান্দা দিয়ে / সময়ে -অসময়ে বাতাসের ঝাপটা এসে দস্যুর -হাতে থাবা মারে!
৮.কতিপয় মেঘশিশু দলা পাকিয়ে মেঘের ফুটবল খেলছে / আর একদলকে দেখলাম / ক্রিকেটের স্টাম্পে ছুড়ে মারছে বৃষ্টি -কাতর বল।/ আর ব্যাট হাতে সুন্দর বনের বাঘ ছক্কা হাঁকাচ্ছে ইচ্ছে মতো।/
৯. তোমার জানালা খুলে রেখো প্লিজ/ জিউসের লোভে-ভরা আমি নামবো স্বর্নবৃষ্টি/জন্ম দেবো অ্যাডোনিস/ প্রকৃতি গর্ভের ওমে
১০. সময় আমার মনে হতো এ তো মেঘের ফোটা নয়, যেন আল্লার চোখের পানি / অজস্রধারায় ঝরছে। নিরাক-পড়া মধ্য দিনের বৃষ্টি সেই বেদনারই কথামালা বলে মনে হতো আমার। 
১১.রিনি আমাকে চুমু খেলে আমি সাহসে ভর করে আড়াল থেকে উঁকি দিই/টুকিও দিই মাঝে-মাঝে! / মুখের গন্ধের মতো সে আমাকে আপনার করে রেখেছে বহুকাল! / ব্রাশ করে, মাউথওয়াশে নিজেকে যোগ্য করে তুলি রোজ রাতে, / তবু কোথায় যেন লুকিয়ে থেকে যায় সেই ভেতো ঘ্রাণ, চামারার মতো মান/-গেয়োদের গোবরে লেপা উঠোনের মতো হাসি / কিন্তু সহসাই ভয় ঝাপটে ধরে আমাকে, / সিনায় ওঠে ঝড়/ তারপর কাঁচা আমের মতো ঝরে পড়ে অকালেই আমার আশা’
একজন বড় কবির বড়ত্ব বোঝা যায় তার চিত্র কল্পের নতুনত্বে, মনোহারিত্বে এবং এর কাব্য ভাষার চমৎকারিত্বে। চিত্র কল্পসমৃদ্ধ কবিতা পরিকল্পনা করে লেখা যায়না। চিত্রকল্প কবির কাব্য ভাষায় প্রকাশ পায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে। এটা অবশ্য কবির আবেগঘন মনের, চিৎেপ্রাকর্ষের ও মেধার শক্তিমন্তের ওপর নির্র্নিভর করে। প্রকৃত কবি, সৃস্টিশীল এবং ব্যতিক্রমী চিন্তার কবিরাই কাব্য সাহিত্যে অবদান রাখতে সক্ষম হন। মাহবুব হাসান একজন অগ্রসর চিন্তার এবং ব্যতিক্রমী কাব্য ভাষার, চিত্রকল্পের কবি। তার চিত্রকল্পের পালকে ঝলকে ওঠে প্রেম প্রকৃতির জটিল উপকরণ, উত্তর আধুনিক ও উত্তর ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়া।
 

Link copied!