১১ দলের ঐক্যে ফাটল ধরানোর ষড়যন্ত্রে পা দেব না: মামুনুল হক
নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ দলের ঐক্য নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের ফাঁদে পা দেবেন না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক। তিনি বলেন, রাষ্ট্র মেরামত, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রূপরেখা নির্ধারণ, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা ও ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করার লড়াইয়ে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। জনগণের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন মামুনুল হক। এর আগে সকাল ১০টায় বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ১১ দলের শীর্ষ নেতা ও মহাসচিবরা এতে উপস্থিত ছিলেন।
মামুনুল হক বলেন, হাজার হাজার শহীদের রক্তের দায় নিয়ে তাঁরা রাষ্ট্র মেরামতের লড়াইয়ে নেমেছেন। এই ঐক্যকে শুধু বিরোধী দলের ঐক্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নির্ধারণ, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা ও ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করার লক্ষ্যেই তাঁরা একসঙ্গে কাজ করছেন। সময়ের সঙ্গে এই ঐক্যের পরিসর আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ
১১ দলের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে মামুনুল হক জানান, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও নাগরিক জীবনের সংকট সমাধানের দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা। এর ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম ও রংপুর অভিমুখে লংমার্চের পর আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত তৃতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি জানান, ওই দিন সকাল ৭টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। পরে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করে লংমার্চ কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে। জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন সংকট সমাধানের দাবিতে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান মামুনুল হক। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিচার বিভাগের দলীয়করণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিও লংমার্চে তুলে ধরা হবে।
এ ছাড়া শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড, জুলাই গণহত্যা ও শাপলা গণহত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সরকারকে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
মামুনুল হক বলেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী দল হিসেবে তাঁরা সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করছেন এবং এ পর্যন্ত সহনশীল কর্মসূচি পালন করেছেন। তবে সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণে আগ্রহী নয় বলে মনে হচ্ছে। জনগণের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে আরও কঠোর হওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসে জনগণের মনোভাব, ইচ্ছা ও প্রত্যাশা অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। অন্যথায় পরিণতি ভালো হবে না।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের কারণে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান তিনি।
মামুনুল হক বলেন, নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে উদ্বেগের নিরসন না হলে কমিশনের বিরুদ্ধে বড় কর্মসূচি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ১১ দলের বৈঠকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান তিনি। আগের অবস্থানই বহাল রয়েছে।
ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে উদ্বেগ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারের মতো বিষয়ে বক্তব্য আসা আতঙ্কজনক। এ ধরনের বক্তব্যে তাঁরা স্তম্ভিত এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফরের সফরসঙ্গী নির্বাচন ও আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, সফরসঙ্গী হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের নেওয়ার বিষয়টি মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি করছে। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরকে ঘোরাফেরা ও বিনোদনের সফরে পরিণত করার মতো আয়োজন থেকেও বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদের চতুর্থ অধিবেশন সামনে রেখে বিরোধী দলের উদ্বেগের কথা তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, সরকারের এজেন্ডা কতটা জনবান্ধব হবে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তাঁরা সন্দিহান। অধিবেশনের আগে বিরোধী দলগুলো আবারও বৈঠক করে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে।
গোপালগঞ্জ ও খুলনায় কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা
ঢাকা থেকে খুলনা ও কুষ্টিয়াগামী লংমার্চের পথে গোপালগঞ্জ থাকায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে মামুনুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা নেই বলে তাঁরা মনে করেন।
তিনি বলেন, গোপালগঞ্জে ইসলামপন্থি ও দেশপ্রেমিক বিপুলসংখ্যক মানুষ রয়েছেন। লংমার্চের সময় তাঁরা ব্যাপকভাবে রাজপথে থাকবেন বলে আশা করছেন। কোনো দূরভিসন্ধিমূলক তৎপরতা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা হলে তা মোকাবিলা করা হবে। গোপালগঞ্জের প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে এর দায় সরকার ও প্রশাসনকে নিতে হবে।
খুলনায় লংমার্চের সমাবেশস্থল হিসেবে জেলা স্কুল নির্ধারণের বিষয়ে মামুনুল হক জানান, জায়গা ছোট এবং প্রবেশপথ সংকীর্ণ হওয়ায় সেখানে কিছু সমস্যা রয়েছে। এসব বিবেচনায় সমাবেশস্থল চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হতে পারে।
এদিকে, ভারতের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে যাঁরা এ ধরনের অভিযোগ করছেন, বৈঠক সম্ভবত তাঁদের সঙ্গেই হয়েছে। বিষয়টি তাঁরা ভালো বলতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আ.দৈ/আরএস




















