বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬,
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
অর্ণব হত্যা মামলা
আসামিদের পক্ষে প্রতিবেদন পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন পরিবারের
জিজ্ঞাসাবাদ করেনি মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের # বাদীর আদালতে নারাজি আবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:২১ পিএম  আপডেট: ১৫.১০.২০২৬ ৫:৪৪ পিএম  (ভিজিট : ৫)
X

রাজধানীর ধানমন্ডিতে আল মুক্কাবির ইসলাম অর্ণবের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ না করেই আসামিদের পক্ষে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। এমন অভিযোগ করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, মৃত্যুর পেছনে শতকোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়নি। এতে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। 

মামলার বাদীর অভিযোগ, আসামিরা পুলিশের যোগসাজশে মামলাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। অর্ণবের মা হালিমা খাতুন বলেন, এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। অথচ পুলিশ মনগড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে দিয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় আঘাতজনিত কারণে মৃত্যু। কিন্তু ধানমন্ডি থানার পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে প্রতিবেদন দিয়েছে। পরে অর্ণবের মা হালিমা খাতুন ওই প্রতিবেদনের নারাজি আবেদন করেছেন আদালতে ।

অর্ণবের মা হালিমা খাতুন বলেন, ‘ছয় মাস হয়ে গেল, কিন্তু আমরা এখনো ন্যায়বিচারের কোনো অগ্রগতি দেখছি না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি, তারা সবাই জামিনে বাইরে। অথচ মামলার সাক্ষীদের একজনকেও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ না করে  মিথ্যা গল্প রচনা বানিয়ে আত্মহত্যা বলে প্রতিবেদন দিয়েছে । বাদীপক্ষের সব অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল করিম বলেন, ‘আমার তদন্তে যা এসেছে প্রতিবেদনে তাই উল্লেখ করেছি।’

জানা গেছে, অর্ণবের মৃত্যুর পর একটি হত্যা মামলা করে পরিবার। স্বজনরা প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, এই মৃত্যুর পেছনে শতকোটি টাকার সম্পদের বিরোধ রয়েছে। বাবার রেখে যাওয়া শতকোটি টাকার সম্পদ হাতিয়ে নিতে তার চাচা ও ফুপুরা পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ নিহতের মা হালিমা খাতুনের।

নিহত অর্ণবের পরিবারের অভিযোগ,মৃত্যুর দু’দিন আগেও অর্ণব তার খালা ও মাকে জানিয়েছেন, তাকে মানসিক নির্যাতন করছেন তার চাচা। তার চাচা ওসমান গণি ও তার স্ত্রী অর্ণবের বাসায় এসে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে আখ্যা দেন। তারা তাকে তাদের পরিচিত ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য চাপ দিলে অর্ণব অস্বীকৃতি জানান। পরে তারা অর্ণবকে জোর করে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে অর্ণব কৌশলে সিগারেট কেনার নাম করে ঘরে থেকে বেরিয়ে খালা শাহনাজ বেগমের বাসায় চলে যান, সেখানে তাদের সবকিছু খুলে বলেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, বাবার মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলে অর্ণব পৈতৃক শতকোটি টাকার সম্পদ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর থেকে ছোট চাচা ওসমান গণি, জাহিদ মিয়া ও হারুনের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রিতেও বাধা দেওয়া হয়। পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে এবং আইনি জবাবদিহি থেকে রেহাই পেতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যার নাটক হিসেবে সাজানো হয়েছিল। গত ২ মে দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডি ১১ নম্বর সড়কের একটি ১১তলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে অর্ণবের (৩৪) রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ভবনটির লিফটের মেশিন কক্ষের ওপর থেকে নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানায় পুলিশ।

প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়। তবে গত ২১ মে অর্ণবের মা হালিমা খাতুন অর্ণবের ৩ চাচা-ফুপুসহ ১২ জনকে আসামি করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সেখানে ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মামলার অন্যতম আসামিরা হলেন অর্ণবের চাচা ওসমান গণি ভূঞা (৬৮) ও তার স্ত্রী মাসুদা বেগম মায়া (৭০), আরেক চাচা জাহেদ ভূঞা (৭২) ও তার স্ত্রী সেনুয়ারা বেগম রেনু (৬২)।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, রফিকুল ইসলামের মৃত্যুর পর থেকেই তার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র দ্বন্দ্ব চলছিল। অভিযুক্তরা যৌথভাবে এই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি ভোগদখল, বিক্রি বা হস্তান্তরে বারবার বাধা দিয়ে আসছিলেন। এমনকি অর্ণবের স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও নানাভাবে সীমিত করে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থেকেই অভিযুক্তরা অর্ণবকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।

এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের মাধ্যমে অর্ণবকে ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এই ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রেরই একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয়। সুপরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দিতে এবং আইনি জবাবদিহি থেকে রেহাই পেতে পরবর্তীতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যার নাটক হিসেবে সাজানো হয়েছিল, যাতে প্রকৃত সত্য কখনো সামনে না আসে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলাম ছিলেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক। তার রেখে যাওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে, রাজধানীর ধানমণ্ডির ৮/এ নম্বর রোডে একটি ফ্ল্যাট, ধানমণ্ডি-৩২ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট, সেগুনবাগিচায় কয়েক কোটি টাকা মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট, উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট এবং মালিবাগের মীরবাগে ৫ তলা বাড়ি।

এ ছাড়া যাত্রাবাড়ীতে রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কিশোরগঞ্জের আকবপুরে ১০ একর জমির ওপর উমেদ আলী ভূঞা উচ্চ বিদ্যালয় এবং নীলগঞ্জে আড়াই একর জায়গার উপর রফিকুল ইসলাম কলেজ রয়েছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে কিশোরগঞ্জের খালিয়াজুড়িতে প্রায় একশ’ একর কৃষিজমি ও খামারবাড়ি, তাড়াইল উপজেলায় ২০ একর জমি, দোতলা বাড়ি এবং কিশোরগঞ্জ শহরে ১০ শতাংশ জমি রয়েছে।

মৃত্যুর আগে অর্ণব তার মা ও খালাকে জানিয়েছেন, বাবার মৃত্যুর পর সব সম্পদ বুঝে নেয়ার চেষ্টা করার পর থেকে ছোট চাচা ওসমান গণি, জাহিদ মিয়া ও হারুনের সঙ্গে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয় এবং সম্পদের হিসাব বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। গত দুই বছর ধরে তাকে হুমকি-ধমকি এবং অপমান করে আসছিলেন। এমনকি অর্ণবের বাবার প্রতিষ্ঠান রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয়। এরপর তার চাচা ওসমান গণি ফন্দি করেন তার ছোট মেয়েকে অর্ণবের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তার সমস্ত সম্পদ তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। কিন্তু অর্ণব তার চাচাতো বোনকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে তারা বিয়ে করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।

অভিযোগের তীর গৃহকর্মীদের দিকে: অর্ণবের খালা শাহনাজ বেগম বলেন, বাসায় কর্মরত গৃহকর্মীদের মাধ্যমে অর্ণবকে ঘুমের ওষুধ বা অন্য কোনো অচেতনকারী দ্রব্য খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। বাসায় কর্মরত দুই গৃহকর্মী জেস্টিনা ম্রং ও তানজিলা বেগম অর্ণবকে সবসময় চাপের মধ্যে রাখতেন। তারা অর্ণবের চাচা ওসমান গণির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন। অর্ণব তার মা ও খালাদের মৃত্যুর আগে কয়েক দফায় জানিয়েছিলেন, গৃহকর্মীরা তার ওপর খবরদারি করে। তাকে অপমান করে, সে কখন কি করছে, বাসা থেকে কখন বের হয়, কার সঙ্গে কথা বলে এ সকল কিছু তারা ভিডিও করে চাচা ওসমান গণিকে দিতো।

অর্ণবের মা হালিমা খাতুন বলেন, ২০১৭ সালে অর্ণবের বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই তার চাচা ওসমান, জাহেদ ও ঝরনা সব সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত দুই বছর ধরে অর্ণবকে হুমকি-ধমকি এবং অপমান করে আসছিলেন। সে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। তার ইচ্ছা ছিল নিজে ব্যবসা করবে। মারা যাওয়ার আগের দিন শুক্রবার রাত ১০টায় সে আমাকে কল দিয়ে বলে মা চলো আমরা দেশের বাইরে চলে যাই। তিনি বলেন, আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে, একটা সুস্থ ছেলে কেন আত্মহত্যা করবে। আমি চাই প্রকৃত তদন্ত হোক। বাসায় কর্মরত দুই গৃহকর্মী জেস্টিনা ম্রং ও তানজিলা বেগম ও চাচা ওসমান গণিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে। তার খাবারে স্লো পয়জন দেয়া হতে পারে বা চেতনানাশক মিশ্রিত করে দেয়া হতে পারে।

আ.দৈ/এসআর








Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
অপরাধ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

● About Us    ● Advertisement    ● Terms & Conditions    ● Privacy Policy    ● Copyright Policy    ● Circulation    ● Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝