রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সৌদি আরবকে ঘিরে বাড়ছে চাপ, হুথিদের অগ্রগতিতে নতুন শঙ্কা মধ্যপ্রাচ্যে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৯ পিএম  আপডেট: ১১.০৯.২০২৬ ৭:২৫ পিএম  (ভিজিট : ১১)
X

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন করে জটিল রূপ নিচ্ছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চল ও কৌশলগত দ্বীপগুলোর দিকে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রের দাবি, মোখা দখলের পর হুথি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেছে এবং কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও তাদের উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই নৌপথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিটিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

সৌদি তেল রপ্তানিতে বাড়ছে ঝুঁকি :

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের কারণে নৌ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সৌদি আরবের তেল পরিবহনের বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাব আল-মান্দেব দিয়ে সৌদি আরবের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছিল।

ফলে বাব আল-মান্দেবে হুথিদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও।

সৌদি জাহাজ নিয়ে হুথিদের হুমকি :

হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, লোহিত সাগরে অন্যান্য নৌযানের চলাচল নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা হবে। তবে সৌদি আরবের জাহাজগুলোকে এই নিরাপত্তার আওতায় রাখা হবে না বলে জানানো হয়েছে।

এর আগে জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল হুথিরা। চলতি মাসে সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা আরও বাড়িয়েছে তারা। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহরেও একাধিকবার জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের তেল স্থাপনাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এতে কয়েক ডজন মানুষ আহত হওয়ার কথা জানা গেছে।

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করে বলেছেন, দেশটির সংঘাত নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। মোখা নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে হুথিদের সরাসরি উপস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুথিদের ইরানের ‘এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, হুথিদের উত্তেজনা বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং তাদের কর্মকাণ্ডে যারা সহযোগিতা করছে, তাদেরও এর পরিণতি বহন করতে হবে।

ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে ইরান ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে মিত্র ও সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে আসছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

হুথিদের ইরান-সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও রয়েছে। দীর্ঘদিনের ইয়েমেন যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারে তারা উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।

২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনের সংঘাত বড় আকার নেয়। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বড় ধরনের লড়াই কিছুটা থামলেও সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে।

তেলের বাজারে চাপ

বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ—দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একই সময়ে সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হুথিদের অগ্রগতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দামও গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে গ্যাসবাডি।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতার চেষ্টা

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান ইরানকে হুথিদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রের বরাতে জানা গেছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে পাকিস্তান তেহরানের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, হুথিদের নিয়ন্ত্রণ করে না ইরান।

এরই মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাম্প্রতিক মক্কা চুক্তিও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। চুক্তির আওতায় কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। সৌদি আরবে পাকিস্তানের সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েনের খবরও সামনে এসেছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের নতুন মাত্রা

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার।

হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও যদি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা পর্যন্ত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক উদ্যোগও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। বিশেষ করে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথ একই সময়ে ঝুঁকির মুখে পড়ায় আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আ. দৈ./একে


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝