নেপালে ফের বন্যার শঙ্কা নিহত ৮০৪
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই নেপালে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উজান থেকে ভোতেকোশি নদীতে পানির প্রবাহ বাড়তে থাকায় দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে রোববার সকালে স্থানীয়দের মোবাইল ফোনে বন্যার সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।
বুধবার হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার পর নেপাল ও চীনের তিব্বত অংশে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুই অঞ্চল মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ৮০৪ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিকও রয়েছেন। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ধর্ম রাজ উপ্রেতি জানিয়েছেন, উজানে পানির প্রবাহ বাড়ার তথ্য চীনা কর্তৃপক্ষ নেপালকে জানিয়েছে। এরপরই নতুন করে সতর্কতা জারি করা হয়।
তবে একের পর এক সতর্কবার্তায় দুর্গত এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে। ইতোমধ্যে ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো মানুষ নতুন করে পানি বাড়ার খবরে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা গোবিন্দ শ্রেষ্ঠা বলেন, বারবার বন্যার সতর্কবার্তা পাওয়ায় পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। তাঁর ৭২ বছর বয়সী বাবা ও ৭০ বছর বয়সী মাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে গিয়ে তিনি নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
বাড়ছে মৃতের সংখ্যা, নিখোঁজ হাজারো
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত দেশটিতে ৭৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০২ জন। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সেখানে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৪৬ জন। ফলে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ৮০৪ এবং নিখোঁজের সংখ্যা অন্তত ৩ হাজার ৪৮।
নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের কয়েক শ নাগরিক রয়েছেন। কেউ ওই অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন, কেউ হিমালয়ে ভ্রমণে গিয়েছিলেন, আবার অনেকে পবিত্র কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে সেখানে অবস্থান করছিলেন। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ২৬১। তাদের মধ্যে শতাধিক নেপালের নাগরিক।
ধ্বংসস্তূপে স্বজন ও সম্পদ খুঁজছেন মানুষ
বন্যার পঞ্চম দিনেও নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে। একই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু মেরামতের কাজও শুরু হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি ধাদিংয়ে অনেক বাসিন্দা ধ্বংসপ্রায় বাড়িতে ফিরে গেছেন। কেউ কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষ সরাচ্ছেন, আবার কেউ ঘরের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা শর্মিলা তামাং বলেন, বন্যায় তাঁদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এমনকি বসতবাড়িটিও আর অবশিষ্ট নেই। বন্যার প্রবল স্রোতে বড় কংক্রিটের সেতুর পাশাপাশি বহু ছোট ঝুলন্ত সেতুও ভেসে গেছে। ফলে নদীর দুই পাড়ের বহু জনপদ এখনো কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
কাঠমান্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
বন্যার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক করা। রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথ পৃথ্বী মহাসড়কের বড় অংশে যান চলাচল শুরু হলেও কয়েকটি অংশ এখনো সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো একই সঙ্গে মহাসড়ক থেকে মাটি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছে। খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য জরুরি পণ্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে এই সড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মীরা রোববার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব শুরু করেছেন। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চারটি জেলার ২০ হাজারের বেশি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেতেন। বন্যার পানি নেমে গেলেও বহু বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও তার কাদার মধ্যে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
হিমবাহ ধস থেকেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত
বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় হিমবাহ ধসের পর বুধবার আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়। একটি হিমবাহের নিচের শিলাস্তর ধসে পড়ার সময় হিমবাহের একটি অংশও ভেঙে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাথরের বিশাল স্তূপ ও গলিত বরফের পানি নিচের নদীগুলোতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে নদীর পানি উপচে পড়ে ভয়াবহ স্রোতের সৃষ্টি হয়। সেই স্রোতে নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর, সেতু, সড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে এই বিপর্যয়ের সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তিত হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও পানিসম্পর্কিত দুর্যোগের ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে বাড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নেপালের উদ্বেগ
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান খুবই সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির মানুষ বড় ধরনের দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিকভাবে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সহায়তায় এগিয়ে আসছে মালয়েশিয়া
নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে একটি বিশেষায়িত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল নেপালে পাঠানো হবে। এ ছাড়া দুর্যোগে আটকে পড়া মালয়েশীয় নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও দলটি কাজ করবে। নেপালকে জরুরি সহায়তা হিসেবে ১০ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে মালয়েশিয়া।
নতুন করে বন্যার সতর্কতা জারির পর এখন নেপালের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, নিখোঁজদের সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ও বিদ্যুৎব্যবস্থা দ্রুত সচল করা। একই সঙ্গে উজানে পানির প্রবাহ আরও বাড়ে কি না, সেদিকেও সতর্ক নজর রাখছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
আ.দৈ/এসআর




















